বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৬

বিচারক স্কোরঃ ২.১৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৪৩ / ৩.০

সতীন

ঘৃণা সেপ্টেম্বর ২০১৬

ভালবাসা- ভালবাসা

উপলব্ধি এপ্রিল ২০১৬

রমজান আলীর নিজের বউ

ভালোবাসা / ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৫

দিগন্ত (মার্চ ২০১৫)

মোট ভোট ১৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৬ লোভ

জোহরা উম্মে হাসান
comment ১৬  favorite ১  import_contacts ৮৮২
এক
লোভ করেছিল কি আরতি ? হ্যাঁ লোভ করেছিল সে দিগন্ত জোড়া সীমাহীন ভালবাসার স্বাদ পেতে । তাতে কোন পাপ ছিল না । ছিল না গ্লানি । সীমা পরিসীমা ! কিন্তু সত্যিকারের লোভে পড়েছিল আরতি একদিন । সে লোভে ছিল পাপ ! সে লোভে মৃত্যু যেন নিজেই নিজের বৃত্তে!
পার্বতীপুর রেলস্টেশনের বড় বাবুর দারোয়ান রঘুবীরের একমাত্র মেয়ে আরতি। একটা মোটে মেয়ে হোলে যা হয়। আদরে স্নেহে আর অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে গোল্লায় যাওয়া ।রঘুবীর আর তার বউ ইন্দিরা মেয়েকে তোলা তোলা কোরে বড় কোরে তুলছিলো। ভালো পোশাক আশাক , খাওয়া দাওয়া আর যত্ন আত্তি । মেয়েকে বড় সাধ কোরে সরকারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলও রঘুবীর। কিন্তু স্কুলে ভর্তি করানোই সার । সারা দিনমান সমবয়সী বন্ধুদের সাথে হইহুল্লোর আর ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সময় পার হতো আরতির। ফলে কয়বার যে সে এক ক্লাসে পড়ে থাকলো , তা সে নিজেও যেমন জানে না , তেমনি জানার খুব একটা তোয়াক্কা করলোনা তাঁর বাপ মাও । আরতির কেবল সাজগোজ আর টইটই পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো । তাই ক্লাস এইটে উঠতে না উঠতেই তাঁর থৈ থৈ বর্ষার জল ভরা উচাটন যৌবন মন কেড়ে নিল পাড়ার তামাম উঠতি বয়সী ছেলে ছোকরার ! কিন্ত প্রেমে পড়ার ব্যাপারে আরতি বড়ই সেয়ানা । মা বাবার চোখ রাঙ্গানি তো আছেই সেই সাথে আছে খেলা খেলা সারা বেলা এমন একটা ভাব । আরতি প্রেমের খেলা খেলে । কিন্তু সত্যিকারের ধরা দেয় না কাউকে । বড়ই অধরা যেন সে !
সত্যিকারের প্রেমে পড়লো বটে আরতি একদিন । আর তক্ষুনি বৃন্দাবন পাড়ায় জব্বর কানাকানি শুরু হোল আরতি আর নির্মল এর প্রেম কাহিনী নিয়ে। নিন্দুকে বলাবলি করে -আর ছেলে পেল না বটে আরতি । প্রেম করবি তো কর একবারে এক মাস্তান ছোকড়ার সাথে । সাহস বলে কথা । দুঃসাহস । এ প্রেম ধরে রাখতে পারবে তো আরতি !
দুই
দুঃসাহসে দুক্ষু হয় রে রতি । আরতির প্রাণের বান্ধবী ঊম্মিমালা সময় পেলেই বুঝায় তাঁকে । নির্মলকে ভালবাসাটাসা বাদ দে রে মুখপুড়ী ।কি আছেই বা তাঁর ! কৃষ্ণকালো মুখটার দিকে চেয়ে থাকতে হয় বটে ! ক্যামন একটা কৃষ্ণ কৃষ্ণ ভাব । মাথা ভর্তি কুঁচকানো অঢেল চুল আর ইয়া লম্বা জুলফি ! তা যা হোক । কেবল চেহারা দেখেই পটে গেলি ! জানিসও তো ঘটে বিদ্যে নেই ওর মোটেও । ধরলাম , বিয়ে কোরে তোর কথামতো মাস্তানি ছেড়ে দেবে সে । কিন্তু তোকে সে কি খাওয়াবে ! তাই সময় আছে এখনও । ভাব !
আরতি এসব কথায় মুখ বুঁজে থাকে ।নির্মলকে নিয়ে মন্দ কথা তাঁর প্রাণে সয় না । তবে সব কথার শেষে তার কথা একটাই - আর তা হোল নির্মলকে ছাড়া সে কিছুতেই বাঁচবে না । নির্মলকে সে খুব ভালবাসে । সত্যিকারের প্রেম বলে কথা ! তাঁর আর নির্মলের প্রেম যেন আকাশ আর মাটির খেলা সারাবেলা !
ঊম্মিমালা আরতির প্রেমের এসব টানফান মানে না । আশা ছাড়ে না সে। প্রাণের বান্ধবীকে যে বাঁচাতেই হবে নির্মলের হাত থেকে ! তাই ফাঁক পেলেই সে গলা বাড়িয়ে বলে – শোন রতি , ভাল্লাগা আর ভালবাসা এক নয় । ভাললাগলেই যে ভালবাসতে হবে সে দিব্যি তোকে কে দিয়েছে । এখনও সময় আছে তোর শুধরোবার ।
কিন্ত আরতির কানে এসব কোন কথাই যেন যায় না ! আর নির্মল ছ্যামড়াটাও হয়েছে তেমনি । চিনে জোখের মতো সে লেগে আছে আরতির পেছনে । কোথায় গেল সেই দিনভর মাস্তানী । রাত বিরতে রেলের ওয়াগান ভাঙ্গা আর চুরির মাল বিক্রির টানপোড়ন !দড়াদড়ি ।
নির্মলের চুনোপুটি সাগরেদরাও তাঁকে বুঝায় । বলে- বস, এভাবে বসে বসে আর কন্দিন । চটপট বিয়ে কোরে নাও তো তোমার আরতি মালাকে । তারপর থিতি হয়ে আবার কাজকামে মন দাও । তুমি এভাবে ঝিমিয়ে থাকলে চলে না তো আমাদের ।
নির্মল তাঁর ইয়ারবন্ধুদের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় আরতির বাবামায়ের কাছে !
বিয়ে ? আরতি আর নির্মলের বিয়ে । এ বিয়ে অসম্ভব । এর চেয়ে মেয়ের গলা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া ভাল ! আরতির বাপ রঘুবীর তার জোর মতামত জানিয়ে দেয় । আরতির মা ইন্দিরাও তাই মত । স্বামীর কথাই শেষ কথা । কিছুতেই একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেবে না তারা ঐ মারকুটে দাঙ্গাবাজ ছ্যামড়াটার সাথে । কোথায় আরতি আর কোথায় সে ! দেখতে শুনতে হাজারটা মুখের মেয়ের থেকে আলাদা আরতি । ধবধবে সাদা রঙের পটল চেরা মুখটিতে একটা প্রতিমা প্রতিমা শ্রী । উদ্ভিন্ন শরীর জুড়ে স্পর্ধিত যৌবনের খেলা । এহেন মেয়েকে বিয়ে করতে উপযুক্ত যুবক পাত্রের অভাব নেই ।
সেই থেকে ফাঁক পেলেই মেয়েকে জোর শাসায় রঘুবীর আর তার বউ ইন্দিরা ।জোর গলায় বলে - বেচাল কিছু দেখলে একবারে শ্রী ঘরে বাস হবে নির্মলের , এই বলে রাখলাম কিন্তু। ভেতরে ভেতরে বুদ্ধি এঁটেছে তাঁরা- মেয়ের আঁচলে রশি বেঁধে দিন কয়েকের মধ্যেই তাঁকে বিয়ের পিড়িতে বসাবেই বসাবে । সুপাত্রও ঠিক হয়ে গেছে !
কিন্তু প্রেম বলে কথা । বাবা মায়ের কড়া চোখ এড়িয়ে আরতি এক কাপড়ে সত্যি সত্যি একদিন নির্মল দাসের সুঠাম দুহাত ধরে চম্পট দিল । পার্বতীপুর রেলস্টেশন থেকে একেবারে সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন !
তিন
আসলেই সে সময় ভালবাসার লোভ করেছিল আরতি । ঠিক কি বেঠিক কি করেছিল সে , তা ভাবার সময় কিংবা অভিপ্রায় তার তখন কোনটাই ছিল না । সে কেবল মনে মনে জানতো ভালবাসার লোভে কোন পাপ নেই । কেবলই তাতে পুণ্য । আর সেই পুণ্যের হাত ধরে মা বাবাকে ছেড়ে এক অচেনা অজানা পথে পাড়ি জমিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছিল সে । নির্মল দাসের কথা অবশ্য আলাদা। তাঁর ঘর বাড়ী নেই । নেই বাপ মা । তিনকুলে নেই বলতে কেউই নেই ।আরতিকে পেয়ে সে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল !এখন আরতিই তাঁর সব । তাঁর জীবন মরণ !
রেল লাইনের পারে ভাড়া করা চিলতে ঘরটাতে আরতি আরতি করে সারা বেলা কাটে নির্মলের । আহা , কি যে মধুর সে জীবন তা বলে যেন শেষ করা যায় না । আরতিকে বুকে জড়িয়ে দিনরাত খুনসুটি করে সময় কাটে নির্মল কুমা্রের ।
এভাবে কেবলি ভালবাসা-বাসি করে গেল অনেকগুলো দিন । নির্মল শুয়েবসে দিন কাটায় । আরতির এখন তা দেখে দেখে আর ভাল্লাগে না । লাগবেই বা কি করে ? হাতের টাকাকড়ির টান পড়েছে । তাই ইদানীং প্রায়ই স্বামীকে তাঁর দায়িত্ব কর্তব্যটা বুঝিয়ে দিতে আরতি পিছ পা হয় না । বলে – পুরুষ মানুষ হোয়ে আর কদ্দিন এভাবে শুয়ে বসে সময় কাটানো । একটু নড়ে চড়ে বসো । জমানো টাকাগুলো যে শেষ হয়ে যায় যায় ।
বউয়ের এসব জাগতিক হিসেব নিকেশের কথায় কান দেয় না নির্মল । বউকে শান্তনা দিয়ে বলে- হবে গো হবে । সব হবে । আগে আমার সোনার পিতিমা বউকে দুচোখ ভরে আর একটু দেখে নেই । তারপর তো অন্য হিসেব ।
বউকে এভাবে দেখতে দেখতে নির্মল শুয়ে বসে গরিয়ে দিল ম্যালা দিন । আরতি কড়ে কড়ে হিসেব কষে বের করে দু বছর তিন মাস পনের দিন ! এতগুলো দিন গ্যালো মানুষটার এখনও কাজে কর্মে মতি এলো না !কাহাতক এসব ছেলেমানুষি সহ্য করা যায়- আরতি মনে মনে বলে !
চার
একেবারেই ভালো লাগে না আরতির নির্মলের শূন্য মুখে কেবল ভালবাসার প্যানপ্যানানি ! কাজ করে নিজের বউকে যে খাওয়াতে পারে না , সে আবার পুরুষ মানুষ নাকি ! এখন মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে ঊম্মিমালার সেই সাবধান বানীগুলো ! আসলে সত্যি কথাই বলেছিল সে সেদিন ।নির্মলের কি বা আছে যা দিয়ে সে আরতিকে খাইয়ে পড়িয়ে সুখে রাখতে পারবে সে ! আজকাল তেমনতরো কথা বলে আরও একজন । আর সে হলো-কাজেম আলী । পাড়ার সবচাইতে বড় দোকানটার মালিক । আরতিকে সে গায়ে পড়ে ফি মাসের মাসকাবারি বাজার বাকি দেয় । আরতি দামের কথা আগ বাড়িয়ে বলতে গেলে, কাজেম আলী বারে বারে মাথা নাড়িয়ে কেমন করে যেন হাসতে হাসতে বলতে থাকে – দামের কথা বলে বউদি আমাকে লজ্জায় ফেলবেন না । যেদিন পারেন সেদিন দাম শুধরে দিবেন ।
কাজেম আলী লোকটার উপর আরতির শ্রদ্ধাভক্তি আর ভালবাসা যেন দিনকে দিন বাড়তেই থাকে । দুপুরের রান্নাবান্না শেষ কোরে ঘরের বেড়ার কোনে লাগিয়ে রাখা চিলতে আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে কেবল সে কাজেম আলীর বড় মনটারই হিসেব কষে। এই বিদেশ বিভুয়ে এই লোকটা না থাকলে কি যে দশা হতো !
কাজেম আলীর বড় মনের কথা শুনিয়ে শুনিয়ে স্বামীকে কটূক্তি করতে আজকাল আরতি আর দ্বিধা করে না । বলে , কাজেম আলী আর কদ্দিন এমন বিনে পয়সায় বসে বসে তোমায় খাওয়াবে ? এখনও সময় আছে , একটা কিছু কর । না হলে হাড়ি কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে শীঘ্রি , এই তোমায় সত্যি সত্যি বলে দিলাম !
পাঁচ
রঘুবীর প্রথম প্রথম দু চারজন লোক লাগিয়েছিল মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে পেতে । নিজের সন্তান বলে কথা । আপন রক্তের বীজ। তাকে কি অবজ্ঞা করে ঘরে দোর এঁটে বসে থাকা যায় কখনো ?
মেয়েকে না দেখতে পেয়ে ঘরে রঘুবীরের বউ মানে আরতির মা ইন্দিরার যাই যাই দশা । মেয়েকে ফিরে না পেলে নিজের দেহ নিজেই ভরা নদীর জলে বিকিয়ে দেবে সে । এই প্রতিজ্ঞাই তাঁর । দিগন্ত জোড়া জল নাকি ডাকে তাঁকে রাত্রিদিন। বলে আয় , আয় ।
রঘুবীর চোখের জল ফেলে না বটে । কিন্তু মেয়ে হারানোর ব্যথা সইতে না পেরে রাগে ক্রোধে বাড়ী মাথায় করে রাখে রাত্রিদিন। অবলা বউটাকেই শাসায় বারে বারে । বলে - এসব কাঁদাকাটি হা হুতাস বাদ দিয়ে যেখান থেকে পারিস ফিরিয়ে নিয়ে আয় আমার মেয়েকে !
-অহ , তুমারি খালি মেয়ে , আমার মেয়ে না ।ইন্দিরা বিড়বিড় করে বলে । সেসব কথার কিছুটা কানে যায় রঘুবীরের আর কিছুটা বা যায়ই না । কিন্তু তাতে কি ।
ঘরে ফিরলেই রঘুবীর তেতিয়ে তেতিয়ে বউকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে থাকে- ত তুর মেয়ে হবে ত ভেগে যেতে দিলি ক্যানে । কি কাম ছিল তর মেয়েকে দেখা ছাড়া । তাও পারলি না । কেবল খাওয়া আর ঘুম ঘুম করে সময় কাটালি । মেয়েকে দেখেশুনে রাখলে সে কি আর এমুন করে পালায় যেতে পারতো । আর পালাবি তো পালা , পালালি এক গোঁয়ার মাস্তান ছ্যামড়ার হাত ধরে । ভাল কাউকে নজরে পড়লো না তর অভাগি ! শয়তানি । রঘুবীর বউয়ের পাশাপাশি মেয়েকেও শাপ –শাপান্ত করে ।
আজকাল স্বামীকে ভীষণ পায় ইন্দিরা। রঘুবীরের সব কথা শুনেও না শোনার ভান করে সে।পারতপক্ষে কথার পিঠে উত্তর কাটা ছেড়েই দিয়েছে ইন্দিরা একরকম । কেবল মেয়েকে উদ্দেশ্য করে রাতদিন পাগলের মতো মনে মনে বলতে থাকে -কি দয়ামায়াহীন মেয়েরে তুই । মাবাপের কথা ভাবলি নে । একটুকুও মনে পড়লো না তঁর জন্মদাত্রী মা বাপের কথা । কি দেখলিরে তুই অই দুমড়া দামটাড়ার মধ্যে !
মেয়েকে নিয়ে বেশী বকর বকর করলে , বউকে দু এক ঘা মারতেও এখন আর দ্বিধা করে না রঘুবীর । পাগল , নির্ঘাত পাগল হোয়ে গ্যাছে মেয়েমানুষটা মেয়ের শোকে । এ হেন মানুষটাকে সামলানো রঘুবীরের সাধ্যির বাহিরে !
যা ভাবা তাই কাজ ! গত সপ্তাহে নিজে গিয়ে বউকে তাঁর ভাইদের কাছে রেখে এসেছে রঘুবীর। রাগে । না অভিমানে ? নাকি আশাহীন উৎপাতহীণ একাকী জীবন কাটিয়ে দেবার ইচ্ছায় । এর কোনটা না সবটা তার কিছুই এখন হিসাব করার সময় যেন নাই তার । চাকরিটা এখন ঠিকমত করতে হবে নাকি। না হলে মাথা পাগল বউটার চিকিৎসা চলবে কি করে?
ছয়
সান্তাহার রেলস্টেশনে মাস্তানী চলে না নির্মল দাসের । পার্বতীপুর রেলস্টেশনে সে ছিল দাদাদের দাদা। কিন্তু নতুন এই বসতিতে কে কার দাদা ! কে তাকে পাত্তা দেয় । দল বাঁধতে কেবল দেহের শক্তি হলেই চলে না । পেশীর শক্তির সাথে পয়সার ঝনঝনানীও থাকতে হয় ।নির্মল দাসের ইদানীং পয়সার বড় অভাব । জটিল মন্দ ভালো উপার্জনের যা কিছু হাতে করে নিয়ে এসেছিল সে - দি ন কে দিন সেখানে পড়ছে নাটাই এর সুতোর টান । মাঞ্জাবিহীন সে সুতো । তা যে প্রায় ছেড়া ছেড়া , বউয়ের হাবভাব দেখে তা ভালভাবেই আন্দাজ করতে পারে নির্মল ।
তবুও নির্মল বউকে ভালবেসে ধরা গলায় বলে- এখন কি যে করি বউ তুই একটা বুদ্ধি দে !
আরতি রাগে গরগরিয়ে বলে – কি আর করবে । খেটে খাও । প্রতিজ্ঞা করেছিলে না পালিয়ে আসার সময় , ভালো পথে ফিরে আসবে । কামকাজ করে খাবে ।
আহা , নির্মল কি কাজের ধান্দা করে না । করে । ভালো কাজ না পেয়ে মনের বিরুদ্ধে যেয়ে মন্দ কাজেরও সুযোগ খোঁজে । কিন্তু তাও পায় না ।
সাত
বাপের কাছে হাত পাততে যাবে কি আরতি ? না , না কিছুতেই না । মা দু মাস হয় গত হতে না হতেই বাপ আবার নতুন করে টোপর পড়ছে । এই বাপ কি আর আগের বাপ আছে ?
ঊম্মিমালার কাছ থেকেই এ খবরটা পাওয়া । ঊম্মিমালা ফাঁক পেলে সই এর কাছে বেড়াতে আসে । সান্তাহার রেলস্টেশনের ধারে কাছেই তাঁর খুড়তুতো দাদার বাড়ী । তাঁর বউটা ঢের ভালো ।ঊম্মিমালার সাথে তার ম্যালা ভাব । তাই এই বেশী বেশী আসা যাওয়া !
ঊম্মিমালাকে কাছে পেলে আরতির ভাঙ্গা ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠে । ঊম্মিমালা যে কটা দিন থাকে সে কয়েকটা দিন নির্মলেরও যেন মুক্তি । টাকা টাকা করে কদিন বউয়ের মুখ ঝামটা খেতে হয় না । খাওয়া নাওয়া মাথায় তুলে আরতি তাঁর ছেলেবেলার সখির সাথে গপ্পো সপ্পো কোরে দিন কাটায়।নির্মলের ভাব ভালবাসার কথা সেখানে প্রায়ই ফিকে হয়ে যায় ! কাজেম আলী নামের শানদার মানুষটার বড় মনের কাহিনী সেখানে এসে অকারণ বাসা বাঁধে । সেসব কথা ভুলিয়ে দিতে ঊম্মিমালা আরতিকে তাড়া দিয়ে বলে- চুলোয় চাল দে সই । নির্মল দার ফেরার সময় যে হোল ।
তাঁর আবার যাওয়া আর ফেরা , মনে মনে বলে আরতি । তারপর মুখ ফুটেই বলে ফেলে - বাদ দে তো এখন তাঁর কথা। ফেরে ফিরুক , না ফেরে না ফিরুক । বলেই তারপর দ্বিগুণ উৎসাহে বান্ধবীর সাথে গল্পে মাতে সে । কাজেম আলী যে গত সপ্তাহে তাঁকে ঢাকা থেকে লাল সবুজ ডুরি হলুদ পাড় টাঙ্গাইলের শাড়ী কিনে এনে দিয়েছে- তা প্রাণের বান্ধবীকে জানাতে আরতি আর দ্বিধা করে না ।
ঊম্মিমালার আরতির ব্যাপারস্যাপার মোটেও ভালো লাগে না । ঘরে ফেরা নির্মলের মলিন মুখ আর ভীতু ভীতু অসহায় চাহুনীটা দেখলে কেন জানি ভারী মায়া লাগে তাঁর ।


আট
আরতি লোভ করে! যার স্বামীর রোজগারপাতি নাই ,লোভ না করলে তার চলে কি করে । অসহিষ্ণু আরতি স্বামীকে বারে বারে বলে- না হয় আবার আগের মতো হও । মাস্তানি কর । ছিনতাই , চুরি । নির্মল মাথা নাড়ে । না , নাতো না । প্রতিজ্ঞা বলে কথা । কাজ করে খাবে সে । ছোট খাট কাজকর্ম কোরে অভাবে অনটনে সংসার চালানো – তাই সই ! তাতে আনন্দ আছে । আছে তৃপ্তি ।
কিন্তু আরতির টানাটানির এই সংসার করতে একেবারেই আর ভালো লাগে না । ছেলেবেলায় বাপের কামাইপাতি মন্দ ছিল না । এক মেয়েকে রাজকন্যার মতো সাজিয়ে গুঁজিয়ে বাপ মা মানুষ করেছে । কোনদিন সংসারের সামান্য অভাব বুঝতে দেয়নি তারা । এহেন আরতির অভাব সইবে ক্যানো !
অভাব অনটন নিয়ে স্বামীর সাথে দিনরাত ঝগড়াঝাটি আর কথা কাটাকাটি করা যেন এখন নিত্য রুটিনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে । আরতিই গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধায় । নির্মল বাঁধাবাঁধি করে কম । কথার প্রতি উত্তরও দেয় না মোটে আজকাল ! আরতি ফাঁক পেলেই নির্মলকে কাজেম আলীর মহানুভবতার কথা বলতে ছাড়ে না । জানুক , শুনুক নিষ্কর্মা মানুষটা – কি করে বউকে খাওয়াতে পড়াতে হয় । খুশী রাখতে হয় ।
আরতির এ হেন বাড়াবাড়ি দেখে নির্মল নির্বাক প্রায় । এত লোভ তাঁর সাধের আরতির – তা বিশ্বাস করতেও যেন বাঁধে তাঁর মন ।
তবে কি আরতির কাছে আর কানা কড়িও দাম নেই তাঁর ! তবে কিসের এ সংসার । চলে যাবে সে। দূরে অনেক দূরে চলে যাবে সে আরতির জীবন থেকে !

নয়
কাজেম আলীর সংসারে এসে আরতির নাম ধাম পরিচয় , চেহারা সুরাত সব কিছুর পরিবর্তন হোয়েছে । ঝকঝকে তকতকে ফিল্মি মেয়েদের মতো পোশাক আশাক আর চাল চলন এখন তাঁর ! মধ্য বয়সী পেটমোটা কাজেম আলীর তৃতীয় স্ত্রি সে । সুন্দরী বউকে নিয়ে কাজেম আলীর আদিখ্যেতার অন্ত নেই । তা দেখে কাজেম আলীর অন্য দুই বিবি হিংসেয় মরে । চাপা ঠোটে হাসাহাসি করতেও ছাড়ে না । গোপনে বলাবলি করে- কি ভালবাসার ঢং ! আর কয়কাল ! এমন ঢঙ্গের বাড়াবাড়ি তাঁদেরকে নিয়েও করছে ঐ কাজেম আলী নামের লোভী মানুষটা । তারপর নেশা ফুরাতেই নতুন আর এক বিবি । চার নম্বর বিবি ঘরে আসতে আর কয় দিন ! তাদের মতন তখন আরতিরও শিকে ছিঁড়বে !
কাজেম আলীর আর দুই বউ পারতপক্ষে আরতিকে এড়িয়েই চলে । ফাঁক পেলেই মুখের সামনে দু চারটা মন্দ কথা শুনিয়ে শুনিয়ে দিতে দ্বিধা করে না - উহ কি নিলজ্জ আর বেহায়া মেয়েরে বাবা ! কি লোভী । তা না হোলে অত সুন্দরপানা স্বামী আর ধর্ম কর্ম ছেড়ে বুড়ো হাবরার গলায় মালা দিতে আসে !
আরতি এসব কথা আজকাল কানে নেয় না মোটে।আগে হোলে কোমরে কাপড় জড়িয়ে সতীনদের সাথে ঝগড়া করতো সে এসব নিয়ে। তারপর স্বামী বাড়ী ফিরে এলে সতীনদের নামে স ত্য মিথ্যা নানান কথা লাগাতো ! কিন্তু এখন যেন নিজেরই কি হয়েছে তাঁর । টাকা কড়ি নিত্য নতুন কাপড় চোপড় এসব আর আগের মতো ভাল্লাগে না !
সবচেয়ে বড় কথা হোল - থলথলে হাবড়া খাবড়া আধ বুড়ো কাজেম আলীকে দেখলে তাঁর আর সহ্য হয় না মোটে । শয়তান । কামুক বড় লোকটা । তাঁকে দেখলেই এই কথাগুলো মনে আসে আরতির । কাজেম আলীর শরীরের ছায়া নিজের শরীরটায় পড়লেই জলতোলা মাছের মতো হাসপাশ করতে থাকে সে - রাগে ,ক্ষোভে আর অনিচ্ছায়।
দশ
ঊম্মিমালার সাথে নির্মলের বিয়ে হয়েছে খুবই সাদামাটা ভাবে ।ঊম্মিমালাই নিজে যেচে পড়ে অসহায় এই মানুষটার সাথে নিজেকে বিয়ের বন্ধনে জড়িয়েছে !
এখন যে বড়ই সুখে আছে তাঁরা দুজন –তা জানালা দিয়ে কোনকোন দিন নজরে এসেছে বটে আরতির। কি সুন্দর হাসতে হাসতে হাত ধরাধরি করে দুটিতে রিক্সা করে পার হোচ্ছে সদর পথটা । আরতির কথা নিশ্চয় করে ভুলে গ্যাছে নির্মল । ভুলে না গেলে কি আর অমন প্রাণ খুলে কি কেউ হাসতে পারে ? আর ঊম্মিমালা ? সত্যিকারের বন্ধু হলে সেকি এমনটা করতে পারতো । মনে মনে বলে আরতি । তারপর সব ভুলে নিজের লোভী মনটাকেই ধিক্কার দেয় বারে বারে ! সেটিই আসল কথা !
আসলে বড় লোভ করেছিলো সে । ভালবাসার মানুষটাকে তুচ্ছ জ্ঞাণ করে কাজেম আলীর টাকার লোভে নিজের ঘর সংসার ছেড়েছিলো সে – এসব কথা ভাবলেই এখন দু চোখের কোল জুড়ে জলের ধারা বয়ে যায় ! সেই ভালবাসার মানুষটার কথা বারে বারেই মনে পড়ে । মনে পড়ে তাঁকে জড়িয়ে প্রতিটি অনূভুতি । প্রতিটি স্পর্শ !
এই যে না পাওয়া , তবুও কোন কোন দিন ঘুমের ঘোরে নির্মলকে খুঁজে ফেরে আরতি । স্বপনে । আগের মতো ভালবাসার সুরে সুরে নির্মলকে জড়িয়ে ধরে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে সে। বারে বারে অকারণ খুনসুটিতে ভরিয়ে দেয় নির্মলের দেহ মন । কিন্তু ঘুমটা ভেঙ্গে গেলেই আরতি দেখতে পায় - একা , বড্ড একা সে ! নির্মল নামের মানুষটা দূরে । অনেক অনেক দূরে । সে যেন দূরাকাশ !
আকাশ আর মাটির নাকি মিলন হয় না । আরতি জানে বটে কিন্তু তা বিশ্বাস করতে আজও তাঁর মন চায় না । প্রাণ চায় না । ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে নির্মলের বিশাল বুকে লুটিয়ে পড়তে । কিন্তু তাতো হবার নয় । আরতি মনে মনে ভাবে- মাটির বুকে কি একবারও আর পড়বে না আকাশের ছায়া । মেঘ আর জলের ছোঁয়া ! মিছেমিছি ভাবতেই থাকে সে । ভাবতেই থাকে । আকাশের একটু ছায়া আর মেঘ জলের ছোঁয়া পাওয়ার লোভে এমনি কোরে কাটতে থাকে- কাটতে থাকে আরতির জীবন !
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন