বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৬২

বিচারক স্কোরঃ ২.৮২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

ছায়াজীবন

আমার আমি অক্টোবর ২০১৬

তবুও বসন্ত এসেছিলো

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

কম্বল-কথা

শীত / ঠাণ্ডা ডিসেম্বর ২০১৫

বাংলার রূপ (এপ্রিল ২০১৪)

মোট ভোট ৩০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৬২ জয়

সালমা সিদ্দিকা
comment ২৭  favorite ১  import_contacts ৮৮৬
'মশার ক্রিম নিয়েছ’?
'হ্যা'।
'জ্বর, সর্দি, পেট খারাপের ঔষধ' ?
'হু'।
'ইহানের জন্য সিরিয়াল, বিস্কুট, শুকনা খাবার নিয়েছ'?
'আচ্ছা, তুমি এমন একটা ভাব করছ মনে হচ্ছে আমরা আফ্রিকার জঙ্গলে যাচ্ছি, বাংলাদেশে কি খাবার নেই? এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে কেন’?
'তোমার কি কোনো ধারণা আছে বাংলাদেশে খাবার দাবারের এখন কি অবস্থা? সব খাবারে ভেজাল আর ফরমালিন। লাস্ট হলিডে তে রনির মেয়ের কি হয়েছে শুনবে? বাংলাদেশ এ গিয়ে এমন পেট খারাপ হয়েছে পুরো এক মাস হাসপাতালে, বেড়ানো মাথায় উঠেছে ওদের। ওর মেয়ে বাংলাদেশ থেকে ঘুরে এসে বলেছে আর জীবনেও যাবে না ওখানে। এখন বোঝো'।
'কি যে বল, ওখানকার খাবার খেলে কি সবাই অসুস্থ হয়ে যায় নাকি ? বাংলাদেশের মানুষ কি খাবার খাচ্ছে না? আমরা তো ওখানেই বড় হয়েছি, আমরা কি খারাপ ছিলাম নাকি'?
'দেখো, আমাদের সময় বাংলাদেশ যা ছিল এখন সেরকম নেই’।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ছয় বছর পর বাংলাদেশে যাবার আনন্দে আমি ঝলমল করছি আর মামুন মনে হচ্ছে মহা বিরক্ত। ও অনেক অল্প বয়সে এই দেশে এসেছে। প্রায় সতেরো বছর লন্ডনে থাকার পর ওর মধ্যে আমি আর দেশে ফেরার টান দেখিনা। বেচারা পুরোপুরি ব্রিটিশ হতে পারছে না আবার বাঙালিও থাকতে পারছে না। প্রতিটা হলিডেতে আমি যখন বলি, চলো এবার বেড়াতে বাংলাদেশে যাই, মামুন বলে, ‘আরে বাংলাদেশে গিয়ে কি হবে, চল ইউরোপ ঘুরতে যাই , ইহানকে নিয়ে বাংলাদেশে যাওয়া ঠিক হবে না’।
ইহান যখন ছোট ছিল তখন এই অনাগ্রহটা মেনে নিয়েছি। ছেলেটার জন্মের পর থেকেই একটা না একটা অসুখ লেগেই থাকে। এই জ্বর তো এই পেট খারাপ নয়তো বমি। ডাক্তার বলেছে ইহানের ইমিউন সিস্টেম ডিসর্ডার আছে। এটা জানার পর থেকে মামুন ইহানকে নিয়ে ভিশন সাবধানী। এটা খাওয়ানো যাবে না, ওখানে যাওয়া যাবে না , সেটা করা যাবে না. ইহানের দিকে তাকিয়ে সব মেনে নিয়েছি।বাংলাদেশের টান তাড়িয়ে ইউরোপ টুর এ গিয়েছি।
এবার আমি যাবই , কেন যাব না? আমার একটা মাত্র ছোট বোনের বিয়েতে কেমন করে না যাই।
মামুন প্রথমে বলেছিল, ‘তুমি একাই যাও, আমি আর ইহান থাকি’।
'এটা কিভাবে হয়? তুমি নিতুর একমাত্র দুলাভাই। তুমি যাবে না? ইহান আমাকে ছেড়ে একদিনও থাকতে পারবে না। তাছাড়া মা বাবা দুইজনই ইহানকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছেন, আমি কিচ্ছু বুঝি না আমরা সবাই যাচ্ছি'। আমি জেদ ধরে থাকলাম।
একমাত্র দুলাভাই হবার সংকটে মামুন মহা বিরক্ত। দেশে ওর তেমন কেউ নেই, ভাই বোনরা সব বিদেশে, বাংলাদেশে ওর কোনো পিছুটান নেই. কিন্তু আমি তো পিছুটান ছাড়তে পারিনা। বিয়ের পর প্রথম যখন এখানে আসলাম, প্রায় প্রতিদিন কাঁদতাম, লন্ডনের রুক্ষ বিষণ্ণ হাড় কাঁপানো শীত আমার দম বন্ধ করে দিত। ক্রিস্টমাসের চোখ ধাঁধানো সোন্দর্য আমার মন ভরাতো না। শীতের বিকেলে আমাদের বাড়ির ছাদে নরম উষ্ণ আলো আমাকে যেন ডাকতো সবসময়। মামুন বলতো সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মনে হয় সময় আমাকে এখানে অভ্যস্ত করেছে, ভালো লাগাতে পারেনি , বাংলাদেশের গন্ধ আমার মন থেকে মুছতে পারেনি। মামুনকে এসব বলে লাভ নেই। ও এসব শুনে নির্বিকার থাকে।
আমার কথার বন্ধু ইহান, ওকে আমি বাংলাদেশের গল্প শোনাই।আমার স্কুলের গল্প, পহেলা বৈশাখ-বই মেলার গল্প, ঈদ এ দাদা বাড়িতে পুকুরে সাঁতার শিখতে যাবার গল্প, সিলেটে আমার নানা বাড়ির জঙ্গলে ঘেরা রহস্যময় জগত, যেখানে কত নাম না জানা ফুল,পাখি দেখা যেত, রাতের বেলা বাড়ির উঠানে শেয়াল এসে ডাকাডাকি করত, সেই গল্প , বাবার সাথে কক্সবাজার বেড়াতে যাবার গল্প। ইহান মন দিয়ে শোনে, কৌতূহলে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা মা, ওই শেয়ালটা কি ফ্যান্টাস্টিক মিস্টার ফক্স ছিলো'?
'হ্যা, আরো কত ইন্টারেষ্টিং জিনিস আছে জানো? বাংলাদেশ রয়াল বেঙ্গল টাইগার আছে, তুমি গেলেই দেখতে পাবে'
'সত্যি মা?'
'অবশ্যই সত্যি, আর কক্স বাজারে গেলে তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সবচেয়ে সুন্দর সমুদ্র দেখতে পাবে'।
'সত্যি মা? ওই সমুদ্রে কি ডলফিন আছে? তিমি মাছ আছে?'
'সব আছে, কিন্তু ওরা আমার সাথে দেখা করতে আসেনি, তুমি গেলে তোমার সাথে দেখা করতে নিশ্চই আসবে'।
'আমরা তাহলে কক্সবাজার যাব, মা?'
আমি ইহানকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারি না। মামুন বলে দিয়েছে ইহানকে নিয়ে ঘরের বাইরে একেবারেই যাওয়া যাবে না। বাইরে শপিং করতে বা কোথাও বেড়াতে গেলে ইহানকে বাসায় রেখে যেতে হবে।
'এটা কেমন কথা, ছেলেটা বাংলাদেশে প্রথম বেড়াতে যাচ্ছে, কোথাও বেড়াতে যেতে পারবে না? আত্মীয় স্বজন সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কারো বাসায় যাবে না?'
'মিতু, তুমি জানো ছেলেটা অসুস্থ? একটুতেই অসুখে পড়ে। এত ঘোরাঘুরি করলে ছেলেটা অসুস্থ হবে, তখন তুমি বোনের বিয়ে ইনজয় করতে পারবে'?
আমি আর কিছু বলি না, এমনিতেই অনেক কষ্টে মামুনকে রাজি করিয়েছি, ওর সাথে তর্ক যুদ্ধে যেতে চাই না। ভালোয় ভালোয় দেশে যেতে পারলেই হলো। আমার একটু ভয়ও লাগছে, ইহান এত আশা নিয়ে দেশে যাচ্ছে, যদি ওর আশা ভঙ্গ হয়? যদি আসলেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে?
মামুনকে স্বান্তনা দিয়ে দিয়ে বলি, ‘দেখো ইহানের কিচ্ছু হবে না, ও ভালই থাকবে'। নিজেকেও মনে মনে সাহস দেই।
‘তোমার তাই মনে হয়? বাংলাদেশ এ এখানকার মত ঠান্ডা নেই, কিন্তু বিশ্রী একটা ওয়েদার। দেশ এ পৌছানো মাত্র ঠান্ডা জ্বর হবে, বলে দিচ্ছি'।
হলোও তাই. বাংলাদেশে আসার পরদিনই ইহানের প্রচন্ড ঠান্ডা লেগে গেল. কিন্তু তাকে ইহানকে বিচলিত মনে হলো না, সে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াচ্ছে, নানা নানুর কাছে যখন যা খুশি আবদার করছে, কাজের মেয়ে দুটোর সাথে ভাব করে নিয়েছে আর নিতুর সাথে কম্পিউটার এ গেম খেলছে।সবাই ওকে মোটামুটি আদরে আল্লাদে মাথায় তুলে নিয়েছে, ও যা চাচ্ছে তাই এনে দেয়া হচ্ছে।নিজের হাতে খেতে হচ্ছে না, কেউ না কেউ মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। ইহানের স্কুলে অনেকবার আমাকে শুনতে হয়েছে ইহান অন্যদের সাথে মিশতে চায় না, সোশাল স্কিল ওর কম। কারো সাথে কিছু শেয়ার করে না, অথচ এখানে সবার সাথে কি সহজেই মিশে গেলো।সারাক্ষনই খিল খিল করে হাসছে।
ঢাকা শহরের বিলুপ্তপ্রায় কিছু বাগান ওয়ালা বাড়ির একটির মালিক আমার বাবা। সেই বাগানে ইহান সারাদিন ছুটা ছুটি করে। আমি আর বাবা বারান্দায় বসে চা খাই আর ইহানের কান্ড দেখি।
'কিরে মা, মামুনের কি হয়েছে, আসার পর থেকে কোথাও যাচ্ছে না. সারাক্ষণ গম্ভীর, কারো সাথে কথাও বলে না'।
'বাবা, ও এমনিতেই তো চুপ চাপ, বাসায় বিয়ে নিয়ে এত হইচই, তাই কাউকে হয়ত বিরক্ত করতে চায় না'।
'বিয়ে বাড়িতে হৈচৈ করাই তো মজা'।
ইহান হাত নাড়িয়ে কি যেন দেখাচ্ছে আর চিত্কার করে বলছে 'মা,দেখো কজাপতি!'এই কয়দিনে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলতে শিখেছে, খুব মজা লাগে ওর মুখে ভুল শুদ্ধ মেশানো বাংলা শুনতে।
'ইহান খুব কক্সবাজার বেড়াতে যেতে চায়, তোরা তিনজন নাহয় ঘুরে আয়' বাবা বলে।
'কি যে বল বাবা, বিয়ের এত ঝামেলা রেখে চলে যাব? তাছাড়া মামুন যেতে চাইবে না'।
'ইহান এত বলছিল আমাকে, ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর সুন্দর সমুদ্র দেখতে যেতে চায়।আমি তোদের সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য বাসের টিকেট, হোটেল বুকিং সব করে ফেলেছি। বিয়ের তো আরো দুই সপ্তাহ আছে. তোরা দুই দিনের জন্য ঘুরে আয়'।
'আমাকে কিছু না বলেই কেন এত ঝামেলা করলে বাবা?' মুখে বললেও মনে মনে আমি আনন্দে আত্মহারা।
সেই কবে কক্সবাজার গিয়েছি, পনেরো বছর বয়স হবে।যখন প্রথম সমুদ্র দেখলাম মনে হলো সমুদ্র আমাকে ডাকছে, সেই ডাক উপেক্ষা করা যায় না। বাবাকে প্রচন্ড ভয় পেতাম অথচ বাবার সামনেই পাগলের মত চিত্কার করতে করতে আমি আর নিতু সমুদ্রে ঝাপিয়ে পরেছিলাম।বাবা রাগ করবে এই ব্যাপারটা মাথায় আসেনি। সেই মুগ্ধতা এখনো আমার মধ্যে এক বিন্দু কমেনি।
সব কিছু শুনে মামুন বলল, 'তোমার মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেল? তুমি বাসে করে কক্সবাজার যাবে? তোমার কি ধারণা আছে এখানকার রাস্তা ঘাট সম্পর্কে? ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে কয় ঘন্টা লাগে কিছু ঠিক নাই, এর মধ্যে তুমি ইহানকে নিয়ে যেতে চাও? বিয়েতে এসেছ, বিয়ের অনুষ্ঠান ঠিক মত করে চলে যাবে, এর মধ্যে এসব ঝামেলা কেন করছ?'
'বাবা, চল না প্লিজ, প্লিজ বাবা' মামুনের কোমর জড়িয়ে ইহানের অনুরোধ।
'না বাবা, কক্সবাজার অনেক দূর, তোমার অনেক কষ্ট হবে'
'আমার কোনো কষ্ট হবে না, ওখানে ডলফিন আছে, তিমি আছে, প্লিজ বাবা চল না'
'ডলফিন তিমি এসব কিচ্ছু নেই বাবা, খালি পানি আর ঢেউ আছে, পানি দেখার জন্য এত দূরে কেন যাবে এত কষ্ট করে?'
ইহান ততক্ষণে কেঁদে ফেলেছে, ছেলেটা কাঁদে কিন্তু শব্দ করে না, চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ে । ছেলের চোখের পানির কাছে সব বাবারাই অসহায়, মামুনের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে সেও অসহায়।
শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই কক্সবাজার যাচ্ছি!
---------------------------------------------
বাস ছাড়ার রাত দশটায়, এখন সাড়ে দশটা বাজে। বাস ছাড়ার কোনো লক্ষণ নেই।
মামুন কয়েকবার কাউন্টার এ গিয়ে জিজ্ঞেস করেছে, ওরা বলছে বাস এ কি সমস্যা হয়েছে, ঠিক করছে। আরো একটা খবর নিয়ে আসলো মামুন, কক্সবাজার যাবার রাস্তায় অবরোধ, তাই ঘুরে যেতে হবে অন্য রাস্তায়, তার জন্য আরো চার ঘন্টা বেশি সময় লাগতে পারে।
মামুনের মুখ অন্ধকার, কাঁধে বিশাল ব্যাগটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে, ব্যাগ ভর্তি ইহানের ঔষধ আর লন্ডন থেকে বয়ে নিয়ে আসা খাবার দাবার।
শেষ পর্যন্ত বাস ছাড়ল, ততক্ষণে ইহান ঘুমিয়ে পড়েছে। যেকোনো জার্নিতে আমার ঘুম হয়না, ছাড়া ছাড়া ঝিমুনি আসছিল, ভাবছিলাম সকাল হতে হতে নিশ্চই পৌছে যাব। কোথায় কি! সারা রাত বাস একটু পর পর থেমে যায়, কি নাকি সমস্যা, ড্রাইভার কাকে যেন ফোন করে ধমকা ধমকি করছে, ইহানের ঘুম ও ভেঙ্গে যাচ্ছে বার বার।
আমরা সকালে পৌঁছালাম না, দুপুরেও না, রাস্তা যেন শেষই হয় না. ইহান কিছুই খাচ্ছে না, কয়েকবার বমিও করেছে। গায়ে জ্বরও আছে।
মামুন ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে, আমার দিকে তাকাচ্ছেও না, এটা ওর রাগের প্রথম লক্ষণ, আমার দিকে তাকাবে না, কথা বলতে হলে অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলবে।
ইহান খালি জিজ্ঞেস করছে কখন সমুদ্র দেখবে।সারা রাত ঠিক মত ঘুম হইনি ছেলেটার, মুখ কেমন শুকিয়ে গেছে, মামুন এখন ইহান কে আমার কাছে দেবে না।ভিশন অপরাধী লাগছে আমার, ছেলেটা যদি খুব অসুস্থ হয়ে যায়? ইহান ও কি এখন থেকে ঘুরে যাবার পর বলবে আর কখনো বাংলাদেশ এ আসবে না?এই অবিরাম দুঃসহ যাত্রা কি ওর মনটা বিষিয়ে তুলবে?
দুপুরের পর চট্রগ্রাম পৌছালাম, রাস্তায় বিশাল ট্রাফিক, বাসের ভেতর দম বন্ধ পরিবেশ, গাড়ির হর্ন আর ড্রাইভার এর চিত্কার করে কথা বলা সব কিছু খুবই দুর্বিসহ।ইহানের গায়ে অনেক জ্বর, মামুন ঔষধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, ইহান খাচ্ছে না। আমি বললাম আমার কোলে দিতে, মামুন দেবে না, ও আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। ওর রাগ যখন চরমে পৌঁছে তখন কথা বন্ধ করে দেয়, কিছুতেই মুখ থেকে একটা কথাও বের করা যায় না।
বিকাল চারটায় আমরা পৌছালাম। হোটেল রুমে গিয়ে ইহানের গা মুছে দিলাম, বিছানায় শুইয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম. কান্না পাচ্ছে আমার। ছেলেটা এভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে আমি ভাবিনি, স্বার্থপরের মত নিজের আনন্দের কথা ভেবে ছেলেটাকে এত কষ্ট দিচ্ছি।
'আব্বু সোনা, কিছু খাবে এখন?'
'না মা, আমরা সমুদ্র দেখতে যাব না?'
'না বাবা, তোমার শরীর তো ভালো না, তুমি এখন ঘুমাও, কালকে সকালে তুমি ভালো হলে তারপর আমরা সমুদ্র দেখব'।
'মা আমি এখনি যেতে চাই, নিয়ে চল না মা, প্লিজ'।
আবার ইহানের আকুল আবদার। আমি ভয়ে ভয়ে মামুনকে বললাম, ‘চলোনা,কাছেই তো সী বিচ, ইহানকে একটু নিয়ে যাই'।
'চল না বাবা' ইহান বলে। কি ভেবে যেন মামুন রাজি হয়ে গেল।ইহানকে কোলে করে নিয়ে চলল সমুদ্র দর্শনে।
এটা ইহান আর তার বাবা দুইজনেরই প্রথম কক্সবাজার ভ্রমন। সমুদ্রের কাছাকাছি গিয়ে ইহান যেন এক মুহুর্তে চাঙ্গা হয়ে গেল। বাবার কোল থেকে নেমে দুহাত বাড়িয়ে দুর্বল পায়ে দৌড়ে গেল সমুদ্রের পাড়ে।
ইহানের পিছনে মামুনও দৌড়াচ্ছে, মামুনের মুখে অন্ধকার নেই। ওরা দুজন মনের আনন্দে পানিতে দৌড়াচ্ছে। আমি ক্যামেরা শুধু কিক্ল করে যাচ্ছি, প্রতিটা দৃশ্য অনেক মূল্যবান।
ইহান আর মামুন হাত ধারা ধরি করে লাল সূর্যটাকে সমুদ্রের মাঝে হারিয়ে যেতে দেখছে, ওদের চোখে মুগ্ধতা আর বিস্ময়। আমি ওদের পাশে গিয়ে দাড়ালাম। মামুন আমার হাত ধরল। আমার মনে কোনো গ্লানি নেই। এই দৃশ্য দেখার জন্য না হয় একটু লম্বা পথ আসতে হলো, তাতে কি।
পরদিন সকালে ঝলমলে রোদে আমরা সাগর পাড়ে হেটে বেড়ালাম। খালি পায়ে ইহানকে হাতে দেখে মামুন কিছু বলল না।
ইহানকে নিয়ে বেশ কয়েকবার আমরা সি সাইড হলিডে করেছি। কিন্তু এই সাগর আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আপন। এত সুন্দর উচ্ছল অকৃত্রিম সোন্দর্য আর কোথাও আছে? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না শেষ পর্যন্ত আমরা তিনজন এখানে। একদিনে এই সাগর পাড়ের সব আনন্দ আমরা দুহাত মেলে নিতে চাই।আমাদের হাতে সময় খুব কম, আজ রাতেই আমরা আবার ঢাকায় চলে যাব।
আমরা পাথরের উপর হেটে বেড়ালাম, বালির বুকে নাম লিখলাম আবার ঢেউ এসে সেই লেখা ধুয়ে নিয়ে গেলো, সেটা দেখে ইহান খুশিতে হাত তালি দিচ্ছে। উচ্ছল সাগরের ধারে মৌন পাহাড় আর ঝাউ বনের ছায়া। সাগরের বুকে দোল খাওয়া ডিঙ্গি নৌকা, সবকিছু তুলিতে আঁকা ছবির মত। আমি ইহান আর মামুনের হাত ধরে সেই ছবি স্পর্শ করে দেখছি।
আমার চির গম্ভীর স্বামীর মুখেও এক চিলতে হাসি, সারাদিন।
---------------------------------------------
বাংলাদেশ থেকে এসেছি বেশ কিছুদিন হয়ে যাচ্ছে। লন্ডনে বরফ পড়েছে। সেই বরফ ঠেলে প্রতিদিন সকালে ইহানকে স্কুলে নিয়ে যাই, তারপর দৌঁড়াই কাজে, কাজ থেকে ফিরে ফ্রিজে দুদিন আগে রান্না করা বেবি চিকেনের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমাই আর পরদিন কি কি কাজ করতে হবে ভাবি। কোথায় গেল মায়ের হাতে রান্না করা মাছ, ভর্তা, কোথায় সেই কক্সবাজারের চাঁদা মাছ ভাজা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওসব খাবারের কথা ভাবি।
নিতুর বিয়েতে খুব হৈচৈ হলো। মেলার মত বাসা ভর্তি মেহমান, সবাই হাসছে, জোরে জোরে কথা বলছে। এখানে নিশ্চুপ বাসায় সেসব কথা মনে পড়লে কেমন হাহাকার লাগে। চোখে পানি চলে আসে। মামুন ও কি আমার মত মিস করে বাংলাদেশকে? জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘হলিডে করে এসেছো এখন প্রাক্টিকাল লাইফে আসো, পুরনো কথা নিয়ে বসে থাকলে হবে বলতো? তুমি খুব ইমোশনাল মানুষ মিতু, এরকম হলে হয় না’।
আমি আর কথা বাড়াই না।থাক নাহয় আমার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ভালবাসা। বাংলাদেশ তো আমার হলিডে ডেস্টিনেশন না, ওটা আমার বাড়ি।

আজকে ইহানের স্কুলে প্যারেন্ট টিচার মিটিং। প্রতিবারই আমার একটু নার্ভাস লাগে। কি জানি বলে ইহানকে নিয়ে। এমনিতেই তো ইহানের সবার সাথে মিশতে না পারার ব্যাপারটা আমাকে চিন্তায় ফেলে।
টেবিলের উপর ইহানের ক্লাস ওয়ার্ক খাতা। মিটিং শুরুর আগে ইহানের ক্লাস ওয়ার্ক খাতা দেখছিলাম।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে ইহান বাংলাদেশ নিয়ে লিখেছে:
'পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো দেশ বাংলাদেশ। কারণ এখানে রয়াল বেঙ্গল টাইগার আছে। আমার সাথে দেখা হয়েছে, আমি হ্যালো বলেছি। এখানে সবচেয়ে বড় সি বীচ আছে. এত সুন্দর সি বীচ কোথাও নেই। বাংলাদেশ অনেক সুন্দর আর বাংলাদেশের মানুষ অনেক স্পেশাল। কারণ তাদের বুকের মধ্যে আছে স্পেশাল ভালবাসা’।
কই অন্য কোথাও থেকে ঘুরে এসে তো ইহান এভাবে লেখেনি। আমার মনে হচ্ছে আমার ছেলের মধ্যে বাংলাদেশকে আমি বাঁচিয়ে রাখতে পারব।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন