বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.১৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৩৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

তবুও বসন্ত এসেছিলো

ফাল্গুন ফেব্রুয়ারী ২০১৬

কম্বল-কথা

শীত / ঠাণ্ডা ডিসেম্বর ২০১৫

আমায় করো তোমার জ্যোতি

গভীরতা সেপ্টেম্বর ২০১৫

গল্প - আমার আমি (অক্টোবর ২০১৬)

মোট ভোট ২৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.১৮ ছায়াজীবন

সালমা সিদ্দিকা
comment ১৭  favorite ১  import_contacts ৪৬৫
(নিরু)

ছেলেটা ছায়ার মতো , ধরতে চাইলেও ধরা যায় না। তবু সব সময় আমার কাছাকাছি থাকে ।
রবিন পলাদের মাঠে যখন আমি বরফ পানি খেলতাম , ছেলেটা আমাকে দূর থেকে দেখতো। প্রতিদিন দেখতাম বলে হটাৎ একদিন ছেলেটা না এলে আমার কেমন যেন লাগতো। কাউকে বলতে পারতাম না। পলাটা যা পাজি! শুনে যদি সবাইকে বলে দেয় ? কি লজ্জার ব্যাপার হবে।
মা বলে ধুমসি মেয়ে হয়েছি, তবু কেন বাইরে খেলি। কি এমন বড় হয়েছি? মাত্র তো ক্লাস সিক্সে পড়ি। পলা , নুপুর, সুমি- সবাই আমার চেয়ে লম্বা। তাও মা আমাকেই কেন আটকে রাখে?
একদিন অন্ধকার সিঁড়ি বেড়ে উঠছিলাম। মা নিজের হাতে কাপড়ের টুকরো গুঁজে একটা পুতুল বানিয়ে দিয়েছিলো, আমার হাতে সেই পুতুলটা ধরা । অন্দকার সিঁড়ির উপরে বা নিচে কিছুই দেখা যায় না, যেনো অসীম থেকে শুরু হয়ে অসীমে মিলিয়ে গেছে সেই সিঁড়ি। দেয়াল যেন চেপে ধরছে আমাকে। সিঁড়ি বইতে কষ্ট হচ্ছে আমার। হঠাৎ আমার হাত থেকে পুতুলটা পরে গেলো অতল অন্ধকারে। আতংকে আমি চিৎকার করতে চাই, কিন্তু কেউ যেন গলা চেপে রেখেছে। সামান্য একটা পুতুলই তো কিন্তু আমার মনে হচ্ছে মহা মূল্যবান কিছু হাত ছাড়া করে ফেলেছি।
নিচের অন্ধকারে ভালো করে তাকিয়ে দেখি পুতুলটা নিচে মাটিতে পরে আছে। কই, পুতুল নাতো! মাটিতে পরে আছে সেই ছেলেটা! মাথা ফেটে রক্তে ভেসে গেছে পুরো মেঝে, আমি রক্তের গন্ধ পাচ্ছি সেই সাথে বুকের ভেতর ভয়ানক ধুকপুক! বুক ফেটে যাচ্ছে আমার! এত কষ্ট!

আমি ধড়ফড় করে উঠি! আমি শুয়ে আছি শান্তিনগরের বাসার বিছানায়। ভয়ে,ঘামে ভিজে গেছে পুরো বালিশ।

বুকের ভেতর কষ্টের পাথর আমাকে গুড়িয়ে দিলো। আমি বালিশে মুখ চেপে কাঁদলাম। প্রায়ই এমন ভয়ানক স্বপ্ন দেখি আমি, ঘুম ভেঙে কাঁদি। তবে ছেলেটাকে স্বপ্নে দেখলাম অনেকদিন পর।
আর ঘুম হবে না। গায়ে জড়ানো অগোছালো শাড়িটা গুছিয়ে উঠে ইচ্ছা করলো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই । কিন্তু আমার ঘরের সাথে বারান্দা নেই। তাছাড়া আমার ঘরের দরজা রাতে বাইরে থেকে তালা দেয়া থাকে। তাই বেরুনোর কোনো উপায় নেই।

বাথরুমে গিয়ে মুখে মাথায় পানির ঝাপ্টা দিলাম। খুব শান্তি লাগলো।
পুরোনো আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালাম। কত বদলে গেছে আমার মুখটা! চিনতে কষ্ট হয় নিজেকে। আমি যেন এখনো কমলগঞ্জের দস্যি মেয়ে। কিন্তু আয়নার মানুষটার মাথায় কত পাকা চুল, মুখে ভাঁজ ,চোখের কোলে গাঢ় কালি।
ক্রিমের কৌটা খুলে মুখে মাখলাম।
এই চেহারা নিয়ে আমার কত গর্ব ছিল! কত প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাসের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে এই মুখ। রবিন আর পলাদের বাড়ীর পেছনের মাঠে রোদে পুড়ে ছোটাছুটি করা পাগলা মেয়েটা কখন যে বদলে গেলো, ঘরকুনো লক্ষী মেয়ে যেমন হয় , ঠিক তেমন। মা খুশি ছিলেন। মেয়েটার বুদ্ধি হয়েছে। কি সুন্দর চেহারা মেয়েটার রোদে পুড়ে একেবারে কয়লা হয়ে গিয়েছিলো ,এখন কত সুন্দর !
আমি সুন্দর- এই বোধটা ঠিক কবে হয়েছিল? ছেলেটা যেদিন বলেছিলো ,সেদিন? ছায়ার মতো ছেলেটা পাশে চলতে চলতে এক জীবনে কত কিছুই না শিখিয়ে দিলো।
আমার ভেতরটা কেমন যেন অন্ধকার গহ্ববরের মতো অতল। আমি অস্থির হয়ে কেঁদে উঠি, অবিরাম কান্না.......

(মঈন)

রাত দুপুরে হাউকাউ কান্না কার ভালো লাগে? আমার লাগে না। সারাদিন পরিশ্রমের পর একটু শান্তির ঘুম দরকার, এই বাড়িতে সেটাও সম্ভব না। নিরুর ঘর থেকে মিহি কান্নার শব্দ আসছে। আমার ঘুম পাতলা, অল্পতেই ভেঙে যায়।
আমার কপাল খারাপ , নাহলে কারো বৌ পাগল হয় এভাবে? নিরুর রূপে অন্ধ হয়ে বিয়ে করে ফেললাম। কি হলো সেই রূপ দিয়ে?
বিয়ের আগে নিরুর নাকি একটা প্রেম ছিল। তার বাবা মা ধরে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। সেই ছেলে নাকি নিরুর কাছাকাছি বয়সী ছিল, তার উপর গরিব ঘরের ছেলে। এমন ছেলেকে পছন্দ করার কোনো কারণ নেই নিরুর বাবা মায়ের। আর নিরুও আক্কেল কেমন, এমন একটা অপদার্থ ছেলেকে পছন্দ করেছে !
আমার ঘুম একবার ভেঙে গেলে আর আসতে চায় না। বারান্দায় গিয়ে সিগারেটে ধরালাম।
কত গর্ব ছিল আমার সুন্দরী বৌ নিয়ে। বন্ধুদের চোখ বড় বড় হয়ে যাবে আমার বৌকে দেখে, মনে মনে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে।.....ছেঃ

বিয়ের পরেই দেখি নিরু যেন কেমন। আমার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। বৌয়ের সাথে প্রেম ভালোবাসা করতে গেলে পাত্তা দেয় না, রাগ করলেও পাত্তা নেই! কত কান্ড কারখানা যে নিরু করেছে ঘরে বাইরে। আমার এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াতে গিয়ে কি সব কথা বার্তা বললো। সুস্থ মানুষ এমন কথা বলে না। আমি নিরুকে নিয়ে বাইরে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে দিলাম।
একসময় প্রচন্ড রেগে গেলাম, কোনো পুরুষমানুষ মেনে নেবে বৌয়ের এমন আচরণ? একদিন রাগ করে খুব ধমক দিলাম, চিৎকার করলাম, গালে কষিয়ে একটা চড়ও দিলাম। নিরু হটাৎ মাথা ঘুরে পরে গেলো, জ্ঞান হারিয়েছে। সেই জ্ঞান আর ফেরে না, কি যন্ত্রনা। পরে জানলাম নিরুর বাচ্চা হবে।
তখন নিরুর পেটে অপূর্ব। একরাতে হঠাৎ ঘুম থেকে কাঁদতে কাঁদতে উঠে আমাকে ডেকে তুললো। আমি তো ওর অস্থির কান্না দেখে অবাক!
'কাঁদছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে?'
'না.......তুমি আমাকে ধরো, আমার খুব ভয় লাগছে। কাল রাতে শুভ সুইসাইড করেছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে শুভ এই ঘরেই আছে , খাটের নিচে লুকিয়ে আছে। আমার খুব ভয় লাগছে। '
'কি বাজে কথা বলছো, আমি দেখছি........'
নিরু প্রচন্ড ভয়ে আমাকে খামচে ধরে কাঁপতে লাগলো। আমি বাতি জ্বালিয়ে সারা ঘর খুঁজলাম, কিছুই নেই।
নিরু তবুও কাঁদতে কাঁদতে একই কথা বলতে থাকলো।
আমি শুভ সম্পর্কে খোঁজ নিলাম। আমি জানতাম নিরু শুভকে ভালোবাসতো। কিন্তু সুইসাইড এর ব্যাপারটা জানতাম না। খোঁজ নিয়ে জানলাম কথা সত্য।

নিরুর সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিলো। খালি মায়ের জন্য নিরুকে তালাক দিতে পারিনি। মায়ের এক কথা, তার একমাত্র নাতিকে কিছুতেই দূরে সরানো যাবে না..তাছাড়া তালাক দিলে লোকে কি বলবে?

লোকের কথায় আমি গুল্লি মারি। সেই ঘটনার পর থেকে নিরুর অস্বাভাবিতা কে সহ্য করছে ?আমি নাকি অন্য লোকেরা? আমি করেছি । কত টাকা খরচ করলাম চিকিৎসায়। কিছুদিন ভালো থাকে, রাত দিন ঘুমায়, অপূর্বের সাথে সময় কাটায়, মায়ের মাথায় বিলি কেটে তেল দেয়, আবার কয়দিন পর যে কে সেই -কান্না , চিৎকার, ঘরের জিনিস ভাঙা, কাউকে চিনতে না পারা , সবাইকে সন্দেহ করা, আজেবাজে কথা .......আরো কত কিছু।
নিরুর চেহেরার দিকে তাকানো যায় না, চেহারায় লাবন্যর লেশমাত্র নেই। মাথার সামনের দিকের চুল পরে গেছে। খায় না বলে শরীর শুকিয়ে কাঠ।

নিরু আমাকে কখনো ভালোবাসেনি, আমি ভালোবাসতে চেয়েও পারিনি। একটা মৃত সম্পর্ক টেনে বয়ে বেড়ানো কি যন্ত্রনা সেটা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
আমি অবশ্য ছয় বছর আগে আয়েশাকে বিয়ে করেছি, সে আদাবরে আমাদের পুরোনো বাসায় থাকে। সপ্তাহে ছয়দিন ওখানেই থাকি। শুধু একদিন এসে সারাদিন এই বাসায় আসি, মা আর অপূর্বকে সময় দেই। সামনে অপূর্বর এস এস সি পরীক্ষা । নিরু তো কিছুই দেখে না, আমি এসে যা পারি দেখে যাই। ছেলেটার কি খাবার লাগবে, বই লাগবে- এইসব। এইতো, গতকাল নতুন জ্যামিতি বক্স , ক্যালকুলেটর আর ঘড়ি কিনে দিলাম।

ছেলেটার মুখ চোখ শুকিয়ে গেছে, রাত দিন পড়াশোনা করে হয়তো ক্লান্ত। কতবার জানতে চাইলাম, কি হয়েছে, কিছু লাগবে নাকি। কিছুই বলে না। ও এমনি, কখনো তেমন কিছু আবদার করে না।
আমার ছেলেটা আসলেই অপূর্ব। মায়ের রূপ পুরোপুরি পেয়েছে, আমার মতো না। লেখা পড়ায় ভালো, শান্ত। খুব ভালো ফুটবল খেলে। ছোট বেলায় প্রায়ই বলতো আমি কেন এই বাসায় থাকি না ,এখন আর প্রশ্ন করে না। কয়েকবার ওকে আদাবরে আমার বাসায় নিয়ে গিয়েছি, আমার মেয়ে তিথির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। সে পুরো ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিয়েছে। বাস্তবতা গ্রহণ করার ক্ষমতা সে পেয়েছে। এই গুন তার মায়ের নেই, অপূর্বর আছে। এই পৃথিবীতে টিকতে হলে এই গুন খুবই প্রয়োজন।


(নিরু)

একদিন আমি সুন্দর হলাম। রেশম গুটি থেকে বের হওয়া প্রজাপতির মতো উড়তে থাকলাম। মাঠে ঘাটে রোদ বৃষ্টিতে ঝাপাঝাপি করা এই আমি ছাতা নিয়ে চলাচল করা শুরু করলাম, রোদে যদি ত্বক পুড়ে যায়! সদ্য তরুণীর আলো ঝলমলে সৌন্দর্যে আমি অম্লান হলাম।
হলুদ চন্দন মেখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতাম। ছেলে গুলো বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো, কেউ আবার স্কুলের সামনে। আমি গর্বিত রাজ্হংসীর মতো তাদের প্রেমপত্র গুলো মাড়িয়ে যেতাম। মনে মনে নিজেকে খুব ক্ষমতাবান মনে হতো ,হৃদয় ভাঙার ক্ষমতা নেহায়েত তুচ্ছ না !

শুভ......কবে যেনো আবছায়ার অবয়ব থেকে যেন প্রাণ পেয়ে আমার সামনে এলে! তোমাকে যেন আমি জন্ম জন্মান্তর থেকেই চিনি। কত আপন, একেবারে নিজস্ব। আমি তোমার বাড়ানো হাত ধরে ফেললাম কখন জানি। প্রায়ই বলতে , নিরু আমাকে ছেড়ে যেও না। এই কথাটা সব প্রেমিক তার প্রেমিকাকে বলে। অথচ কি এমন ছিল তোমার দৃষ্টিতে, আমাকে মায়ায় জড়িয়ে রাখতো সকাল দুপুর সন্ধ্যা। ষোড়শী আমি মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে তোমার সাথেই চলতাম দিন রাত ।

নদীর পাশেই আধভাঙা স্কুলটার ভেতর এক সন্ধ্যায় তুমি আমাকে ডেকেছিল। ওদিকটায় কেউ যায়না। অযত্নে ঘরটার দেয়ালে গাছ গজিয়েছে। চারপাশে জংলী গাছগুলো যেন আরো রহস্যময় করেছে পুরো জায়গাটাকে। গা কেমন ছমছম করে।
তোমাকে সেদিন অন্য রকম লাগছিলো, অনেক সাহসী। সাহসী পুরুষ সব নারীর কাছেই আকর্ষণীয়।

সন্ধ্যা নামার আগেই কেমন যেন অন্ধকার চার দিকে , আকাশ জোড়া ঘন মেঘ , বৃষ্টি নামবে এখনই।
তুমি আমাকে টেনে নিলে কাছে। আমার ভেতরটা এত জোরে ধুকপুক করছিলো, মনে হচ্ছিলো বড় রাস্তার লোকজনও বুঝি শুনবে। তুমি বড্ড সাহসী হয়ে গিয়েছিলে সেদিন, আমাকে উন্মুক্ত করতে তোমার একটুও দ্বিধা ছিল না। আমিও চোখ বুজে তোমাকে গ্রহণ করছিলাম। মাত্র ষোলো বছরের একটা মেয়ের কি সাহস! কি অবলীলায় সব কিছু উজাড় করে দিতে পারে আবার পূর্ণতায় উজ্জ্বল হয়! তুমিও কি আমার মতোই অনুভব করেছিলে?

মা আমাকে আর স্কুলে যেতে দেয়নি, মেট্রিক পরীক্ষাও আর দেয়া হয়নি। এত লুকোচুরি করেও বুঝি নিজেকে লুকাতে পারলাম না।
মা বললো বড়োলোক ছেলের সাথে বিয়ে দেবে আমাকে, ছেলের অনেক টাকা, ঢাকায় দুইটা বাড়ি। আমাকে অনেক আরামে রাখবে। প্রথমে জেদ করেছি। পরে কেমন করে যেন গলে গেলাম মায়ের কথায়। ঠিকই তো, জীবনে টাকার খুব দরকার। দামি গহনা, গাড়ি , দেশ বিদেশ ভ্রমণ, তুমি আমাকে এর কিছুই দিতে পারতে ? আমার মতো চোখ ঝলসানো সুন্দরী তোমার ভাঙা ঘরে মানায় না। খালি পাগল করা ভালোবাসায় দিন চলবে? আমি মায়ের কথায় রাজি হয়ে গেলাম।

আজকাল তো অনেক ষোলো বছরের মেয়ে ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে পালিয়ে যায়, আমি যাইনি কেন? সত্যিকরের ভালোবাসা ছিলো না? খালি দেহের প্রেম ছিল আমার? আমি কি শুধুই তোমার ভালোবাসা নিয়েছিলাম খেলার ছলে ? হয়তো বা তাই।

তুমি আমাকে বলেছিলে নিরু তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, তুমি বিয়ে করো না। তুমি কাঁদছিলে, অনেক অনুনয় করেছিলে। আমার নিজেকে আরো ক্ষমতাধর মনে হয়েছে। তোমার উপর করুনা হয়েছে, ভালোবাসা বোধ হয়নি। তোমার অসহায়ত্ব দেখে অবজ্ঞায় হেসেছি মনে মনে । এত নিষ্ঠুর কখন হয়েছি ? অথচ দেখো, তোমার সেই চেহেরাটা আমি কখনও ভুলতে পারি না।

আমার হাসির আড়ালে অন্য কেউ হেসেছিলো কিনা জানি না, বিয়ের পর আমার পুরো পৃথিবী উলোট পালট হয়ে গেলো। আমার স্বামীকে আমি ভালোবাসতে পারছি না- এই অনুভূতিটা কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে, ভাবতে পারো? তার সবকিছুই আমার অসহ্য লাগে। সে আমার শরীরের উপর চড়াও হলে মনে হয় একটা বন্য শেয়াল আমাকে খুবলে ধরেছে । গা ঘিন ঘিন করতো আমার, আমি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে পালাতাম। সেই আধো আলো আঁধারির ভালোবাসাবাসি শুধু টানে আমাকে। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারি না। লোকটা আমার আসে পাশে আসলেই আমি আতংকিত হয়ে যাই ,আমার হাত বাড়িয়ে আমি শুধু তোমাকে খুঁজি। ভেতরের আমিটা এবার আমার উপরেই হেসে ওঠে।
ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে আত্মহত্যা করলে আমার বিয়ের ছয় মাস পর । তোমার সাহস অনেক জানতাম, এতটা হবে ভাবিনি। মা অবশ্য বলে এটা দুর্ঘটনা, তুমি পিছলে পড়েছো। না হলে তো আমার বিয়ের পর পরই মরে যেতে পারতে। তাছাড়া তুমি কোনো চিঠি লিখে যাওনি । তাই আমার অপরাধবোধ হওয়ার কোনো দরকার নেই। সব অকাট্য যুক্তি।
কিন্তু তুমি আমাকে বলেছিলে , তুমি আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। আমি জানি তুমি মিথ্যা বোলো না । এখন তোমাকে দেখলে আমার সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
আবার মাঝে মাঝে যখন আসো না, আমি পাগলের মতো তোমাকে খুঁজি, আমার কথা বলার আর যে কেউ নেই। সেই যে পলাদের মাঠে তুমি দূর থেকে আমাকে দেখতে বলে আমার খুব রাগ হতো , আবার না এলেও কেমন ফাঁকা লাগতো, অনেকটা সেরকম।


(শেষ কথা )

অপূর্ব বসে আছে রেলওয়ে মাঠের নিচু দেয়ালে। তার পাশে মীরা বসে আছে।
অপূর্বর খুব ইচ্ছা করছে মীরার হাত ধরতে কিন্তু সে ধরতে পারছে না। ও জানে, হাতটা ধরলেই ওর চোখ ভেঙে কান্না আসবে।
মীরা আগামীকাল কাতার চলে যাবে, তার বাবার ট্রান্সফার হয়েছে। অপূর্ব চাইলেই প্রতিদিন একবার হলেও মীরাকে দেখতে পাবে না।
'কিরে, চুপ করে আছিস কেন? আমাকে তো যেতে হবে। কিছু বলবি না যাওয়ার আগে?' মীরা নিচু স্বরে বলে।
'তুই সত্যি চলে যাবি?' অপূর্ব মাথা নিচু করে মাঠের ঘাসের দিকে তাকিয়ে বলে। তার চোখ ভরা পানি মিরা দেখুক এটা সে চায় না।
'যেতে তো হবেই। আমি একা একা ঢাকায় থাকতে পারবো বলতো ? তবে আমি বছরে একবার আসবো ঢাকায়, তখন তোর সাথে দেখা করবো, তাছাড়া তুই আমাকে ফোন করবি, ভাইবার করবি, তখন কথা বলবি।'
'ভালো থাকিস। ' বলে অপূর্ব হঠাৎ উঠে যায়। হাঁটতে হাঁটতে মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠে।
আকাশে ঘন মেঘ, মিহি তুলোর মতো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অপূর্বর ইচ্ছা করছে মাথা ঘুরিয়ে মীরাকে দেখতে। আবার মনে হচ্ছে মাথা ঘুরিয়ে দেখবে মীরা ওখানে নেই। সেই শূন্যতা ভয়ানক হবে।
অপূর্ব উদ্দেশ্যহীন ভাবে কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করলো। ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসে ।
নিরু বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বৃষ্টি দেখছে। মাকে দেখে অপূর্বর মনে হলো আজকে মায়ের মন ভালো, কোনো রকম পাগলামি করবে না।
মা যখন ভালো থাকে, অপূর্বর সাথে খুব গল্প করে। অপূর্ব তার মাকে গল্পের বই পড়ে শোনায়, নিরু মন দিয়ে শোনে, এই সময় তার মুখ হাসি হাসি থাকে। পরীক্ষার আগে পড়ার বইও পড়ে শোনায়। পড়াও হয় আবার মাকে বই পড়ে শোনানো হয়ে যায়।
নিরু মুগ্ধ হয়ে ছেলেটাকে দেখে। কি সুন্দর হয়েছে ছেলেটা! কি মায়া করে গল্প পরে শোনাচ্ছে! গল্প শুনতে শুনতে নিরু ঘুমিয়ে পরে। অপূর্ব তার মায়ের মাথায় কিছুক্ষন হাত বোলায় , মায়ের ঘুমন্ত মুখটা দেখতে খুব ভালো লাগে। কেমন অসহায় লাগে মাকে কি এক কষ্ট চেপে রাখে মনের ভেতর অপূর্ব বুঝতে পারে না। ছোট বেলায় অনেক প্রশ্ন করতো। জবাব না পেতে পেতে এখন আর করে না।

অপূর্ব তার মায়ের পাশে এসে দাঁড়ালো।
'কিরে বোকা?এমন বৃষ্টিতে ঘরে বসে আছিস? ভিজবি না?'
'না মা, আজকে ভালো লাগছে না। '
নিরু হাত দিয়ে অপূর্বর মুখটা তুলে ধরে , বৃষ্টিতে ভিজে এসেছে বলে অপূর্বর কান্না ভেজা চোখ দেখে কেউ কিছু বুঝবে না ,কিন্তু নিরু ঠিকই বোঝে। বুকের ভেতরটা হটাৎ কেমন মুচড়ে উঠে। অনেক আগে দেখা একটা মুখ যেন ফিরে এসেছে সামনে।
মায়ের হাত দুটো চেপে ধরে অপূর্ব হটাৎ কান্নায় ভেঙে যায়। নিরুর সামনে যেন কোনো রাখ ঢাক নেই অপূর্বর । যেন ছায়া বীথি তলে এসে অপূর্ব আর সব কষ্ট বিসর্জন দিতে পারে।
নিরু অস্থির হয়ে উঠে, ছেলেকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে। ফিসফিস করে বলে, 'কি হয়েছে বাবা, আমাকে বল, আমি সব ঠিক করে দেবো। '
অপূর্ব কান্না জড়ানো গলায় বলে, 'মীরা চলে যাচ্ছে মা, মীরা কাল চলে যাচ্ছে। ওকে ছাড়া আমি কিভাবে বাঁচবো?'
নিরুর মাথা দুলে ওঠে, হাত পা কাঁপতে শুরু করে। তার সামনে কেঁদে ভেঙে পড়া ছেলেটাকে ও আগে কোথাও দেখেছে, এভাবেই মিনতি করছিলো ছেলেটা কিন্তু নিরু কিছুই করেনি, অবজ্ঞায় দূরে ঠেলে দিয়েছে।
নিরু সমস্ত শক্তি এক করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অপূর্বর হাত ধরে টেনে তোলে। ভালোবাসার একজনকে সে অবহেলায় ছুড়ে ফেলছিলো, আর কখনো ফিরে পায়নি।আজকে তার সামনে যে মানুষটা আছে, তাকে পৃথিবীর সব শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখতেই হবে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন