বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ জুলাই ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৪.০৪

বিচারক স্কোরঃ ২.১২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯২ / ৩.০

গল্প - ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ২০১৬)

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.০৪ রোদন-ভরা এ বসন্ত

কেতন শেখ
comment ১৪  favorite ১  import_contacts ৮৫১
সিফাতের মোবাইল চার্জের অভাবে রীতিমতো কান্নাকাটি করছে।

সারাদিনের ব্যস্ততায় মোবাইলে চার্জ দেয়া হয়নি। ঠিক এই মুহূর্তে যখন মোবাইলের খুব প্রয়োজন, তখনই মোবাইলটা চার্জের অভাবে টি টি করে আর্তনাদ করছে। টিএসসির প্রচন্ড ভিড় আর কোলাহলের মধ্যেও সিফাত সেই টি টি কান্না শুনতে পাচ্ছে।

ফাগুন মাসের তিন তারিখ। ক্যাম্পাস জুড়ে বইমেলার ভিড়। চারপাশে অসংখ্য মানুষ ... রিকশা, গাড়ি, সিএনজি আর ফুটপাথে। বিশ্রামহীনভাবে ভেঁপু, ভুভুজেলা আর গাড়ির হর্ণ বাজছে। সিফাতের ঘড়িতে এখন সন্ধ্যা ছয়টা। সূর্য ডোবার সাথে সাথে টিএসসির সন্ধ্যার আড্ডা শুরু হয়েছে। চায়ের স্টল, ভাজাভুজির দোকানগুলোতে প্রচন্ড ভিড়। সিফাত দাঁড়িয়ে আছে টিএসসির পার্কিং-এ। বহুদিন পর টিএসসিতে আসা। সবকিছু কেমন অপরিচিত লাগছে ... আশেপাশের ব্যস্ততা, ভিড়, সোরগোল ... এমনকি নিজেকেও।

তেরো বছর আগে মাস্টার্স শেষ করার পর টিএসসিতে বা ক্যাম্পাসে এভাবে আসা হয়নি সিফাতের। বিয়ের পরপরই ওরা চলে গিয়েছিলো সাভার ক্যান্টনমেন্টে। এরপর কিছুদিন কুমিল্লায়। ঢাকায় ফিরেছে তিন বছর আগে। এই তেরো বছরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুদের সাথে সিফাত কোনো যোগাযোগ করেনি। এই ধরণের যোগাযোগ আসাদের পরিবারের পছন্দ না। ওরা চায় ঘরের বউ ঘরে থাকবে, বাচ্চাদের দেখবে, শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখবে, ধর্মকর্ম করবে।

আসাদের পারিবারিক সংস্কৃতিতে ঘরের বউয়ের ঘর, বাচ্চা, স্বামী আর ধর্মকর্ম ছাড়া আর কোনোকিছুতে সময় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। চাকরী করা তো অসম্ভব। আসাদের বড় ভাই আজাদের সংসারও একই বাড়িতে। আজাদের স্ত্রী রাবেয়া হিজাব করে। প্রায় সারাদিনই সে ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সারাবছর রোজা রাখে। এসব কারণে সে ঘরের কাজকর্ম করে না। সিফাত ঘরে হিজাব করে না, ধর্মকর্মেও অনিয়মিত। এসব কারণে ওকে প্রায়ই শাশুড়ির কটুকথা শুনতে হয়। ঘরের সমস্ত কাজকর্ম দেখার ভার সিফাতের। এমনকি রাবেয়ার দুই মেয়েও সিফাতের হাতেই বড় হচ্ছে।

সিফাতের বিয়ের আগের জীবন এমন ছিলো না। বন্ধুবান্ধব, পাড়ার প্রোগ্রাম, পিকনিক, আড্ডা, কাজিনদের সাথে আনন্দ, বইমেলা, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি ... এসব প্রিয় অনুভূতি দিয়ে সাজানো ছিলো সেসব দিন। কিন্তু বিয়ের পরের জীবনে সিফাতের চারদিকে অনেকগুলো দেয়াল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেই দেয়াল ঘেরা জীবনের বদ্ধতা। বদ্ধতার মাঝে নিজের নিঃশ্বাসের সাথে বোঝাপড়া হয়ে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে বইমেলার ভিড় আর টিএসসির মুক্ত বাতাসে সিফাতের নিঃশ্বাসগুলো বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। বেপরোয়া সেই নিঃশ্বাসগুলোকে অপরিচিত লাগছে।

মোবাইলের কান্না বন্ধ হয়েছে। ব্যাটারি মিটারে নয় পারসেন্ট দেখাচ্ছে। সিফাত বাপ্পীকে এসএমএস করলো, ‘আমি পার্কিং-এ। তুমি কোথায় ?’

বাপ্পীর সাথে সিফাতের পরিচয় তিন মাসের, ফেসবুকে। সেটাও অদ্ভূত একটা ঘটনা। ফেসবুকের ব্যাপারটা সিফাত শুনলেও সেটার অভিজ্ঞতা নেয়ার কোনো উপায় ছিলো না। বাসার কম্পিউটার আসাদ একাই ব্যবহার করে। ফেসবুক যে মোবাইলে করা যায় সেটা সিফাত জানতো না। মাস ছয়েক আগে একদিন পাশের বাসার শারমিন খুব আগ্রহ নিয়ে ফেসবুকের কথা বললো। সিফাতের একাউন্টও করে দিলো। মুখ টিপে হেসে বললো, হ্যাভ ফান।

বাসার কাউকে না জানিয়েই সিফাতের ফেসবুক শুরু হলো। শারমিনই মোবাইলে সব সেট করে দিলো। ছদ্মনামের একাউন্ট, ধার করা ছবি। কে জানে যদি আসাদের নিজের ফেসবুক একাউন্ট থাকে! ও যদি সিফাতের একাউন্ট খুঁজে পায়! এসব ব্যাপারে শারমিনই সাবধান করলো। তার নিজের দুইটা একাউন্ট ... একটা নামে, একটা ছদ্মনামে। শারমিনের বাসার অবস্হা এতো রক্ষণশীল আর বদ্ধ না হলেও তার জীবনে ভয়ানক সমস্যা আছে। ওর হাসব্যান্ডের রাগ উঠলে হাত মুখ সব চলে। খুব জঘন্য কায়দায় চলে। শারমিন এমনিতে হাসিখুশি হলেও পাশবিক এই যণ্ত্রণার জমাট কষ্ট নিয়ে তার জীবন। আর তাই ফেসবুকের ছদ্মনামের একাউন্টে সে কোনো বিবাহিত নারী না, দশ বছর আগের যুবতী শারমিন। সেই একাউন্টে ওর অনেক নতুন বন্ধু। তাদের কারও কারও সাথে ওর রাত কাটে অনেক কথায়, অনেক গল্পে, জীবনের অনেক রহস্যময় কামনার স্রোতে।

বাপ্পীর এসএমএস এসেছে। ‘আমি আসছি, ফাইভ মিনিটস। তুমি নীল শাড়িতে তো ?’

সিফাত মনে মনে হাসলো। অল্প বয়স হলেও ফেসবুকে বাপ্পীর আচরণ খুব ম্যাচিউর্ড। ওর কথাবার্তা পড়লে মনে হয় ও সিফাতের চেয়েও বড়। গতরাতে যখন চ্যাটিং হচ্ছিলো তখন বাপ্পী বললো, দেখা করতে এতো ভয় পাচ্ছো কেন ?

- কারণ আছে। তুমি আমার ব্যাপারে অনেক কিছুই জানো না।

- তুমি হয় তো বলোনি, কিন্তু আমি আন্দাজ করতে পারি।

- কি রকম ?

এরপর চ্যাটবক্সে কিছুক্ষণের নীরবতা। দেখাচ্ছে বাপ্পী খান ইজ টাইপিং। সিফাত বারান্দার গ্রীলে হেলান দিয়ে বসে আছে। আরামের বসন্ত বাতাস, অন্য সময়ের মতো এতো মশা নেই। রাত সাড়ে এগারোটা, বাসার সবাই ঘুমিয়ে। আসাদ তখনও ফেরেনি, এসএমএস করেছে বারোটা নাগাদ ফিরবে। টুং টাং রিকশার বেল আর মাঝে মাঝে গাড়ির শব্দ ছাড়া রাস্তা মোটামুটি নীরব। আকাশ ভরা একাদশীর মিহি আলো। বাপ্পীর সাথে কথা বলার জন্য সিফাতের প্রিয় প্রহর। এমন প্রহরে মনের গভীরে কি যেন একটা সুর ভাসে। মন শুধু বলে আসাদ আজকে একটু দেরী করে আসুক, আর একটু।

- তোমার শ্বশুরবাড়ির কেউ চায় না তুমি বাইরে কোনো বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করো। কিন্তু তোমার অনেক বন্ধু। তুমি তাদেরকে অনেক মিস করো, অথচ তুমি তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারো না।

সিফাত কিছুক্ষণ ভেবে লিখলো, কিভাবে জানো আমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারি না ?

- তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হলে তো তুমি ছদ্মনামে একাউন্ট করতে না, বা অন্য কোনো ছবি রাখতে না। তুমি নিজেকে লুকানোর জন্য এসব করো, আর এসব কারণেই তুমি আমার সাথে দেখা করতে চাও না।

- তোমার জন্য দেখা করা সহজ, আমার জন্য না।

- আমি জানি আমার ধারণা ঠিক, তবুও তুমি বলো আমি ঠিক বলেছি কি না ...

- আমি দেখা করে বলবো।

- গুড। কালকে আসো, ছয়টায়, টিএসসিতে। আমি তোমাকে নিয়ে বইমেলায় ঘুরবো।

- তুমি একটা পাগল ... এতো কারেক্ট এ্যাসেসমেন্ট করেছো, আর এরপর বইমেলায় তোমার সাথে ঘুরতে বলছো!

ফেসবুকে আবারও কিছুক্ষণের নীরবতা। এরপর বাপ্পীর স্মাইলি স্টিকার। সাথে মেসেজ, ওহ ... তাহলে স্বীকার করলে যে কারেক্ট এ্যাসেসমেন্ট করেছি!

সিফাত বুঝতে পারে না এসব শুনলে ওর কি অনুভূতি হয়, আর সেটা শরীরে না মনে হয় ... কিন্তু বুঝতে পারে যে কোথাও কিছু একটা হচ্ছে। কোনো একটা পরিবর্তন হচ্ছে। কোথাও বসন্ত বৃষ্টি হচ্ছে। অজানা এই অনুভূতিটা সিফাতের অসম্ভব প্রিয়। রাতের এই প্রহরে এমন করে কখনও কারও সাথে কথা হয়নি। বিয়ের আগে অন্জন নামের একটা ছেলের সাথে খুব গল্প হতো, ফোনে। কিন্তু সেই কথোপকথনে এই শিহরণ ছিলো না, এই প্রতীক্ষা ছিলো না। রাতের এই প্রহরে একা বাপ্পীর সাথে এভাবে কথা বলার অনুভূতির শিহরণের সাথে সেসব স্মৃতির কোনো মিল নেই।

বাপ্পীকে সিফাত ওর নাম বলেছে, মোবাইল নম্বর দিয়েছে। কিন্তু অনেক চাওয়ার পরেও ছবি পাঠায়নি। ছবি পাঠানো নিয়ে সিফাতের আপত্তি শুনে শারমিন বললো, কেন ... তোর ছবি পাঠাতে আপত্তি কেন ? তুই ছেলেটাকে পছন্দ করিস ... লেট হিম সি তুই কতো সুন্দরী আর হট! ও তোকে দেখে জল্পনা কল্পনা শুরু করুক। ইয়াং ছেলে, এরা তো এসবই চায়। আমি তো ভাবলাম তোরা ভিডিও চ্যাট শুরু করেছিস। আমি তো কয়েকটার সাথে ভিডিও চ্যাট করি। এসব না করলে তো এদেরকে ধরে রাখতে পারবি না।

- ছিঃ ছিঃ সেটা কেন করবো ?

- আরে সেটা ছাড়া আর কি করবি তুই! সারাক্ষণ ‘কেমন আছো ভালো আছি’ করবি ? ঘরের মধ্যে বন্দী জীবন কাটাচ্ছিস, ছবি ভিডিও ছাড়া ফান কিভাবে হবে ?

- তুই তো বন্দী না, চাকরী করিস ... তুই এসব করিস কেন ?

শারমিন সহজ কণ্ঠে বললো, তোর মাসুদ ভাই রেগে গেলে আমাকে হোর বলে। গত পরশু বাসায় এসে একটা সামান্য কারণে হঠাত রেগে গিয়ে হোর বলে ভিডিও ক্যামেরার ক্যাবলকে চাবুক বানিয়ে আমাকে মেরেছে। বিয়ের দুই বছর পর থেকে এই-ই চলছে। আমার কিসমতে যদি এই-ই থাকে ... হোরই হয়ে যাই। সত্যিকারের হোর হয়েই মার খাই ...

সিফাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, তুই মাসুদ ভাইকে ডিভোর্স কর ...

- না, এতো সহজে না। আমার বাচ্চা আছে, এ্যাসেট, টাকা এসবের ভাগ আছে। জানোয়ারটা বিয়ের প্রথম বছরে পেটে বাচ্চা দিয়ে আমার সর্বনাশ করে রেখেছে .... তখন তো সে ভদ্রলোক। এখন নিজে কোথায় কি করে কে জানে, সেখান থেকে ফ্রাসট্রেশন নিয়ে ঘরে আসে আর আমাকে মারে। এই-ই যদি সে করে, তাহলে আমি সত্যিকারের হোর হয়েই ওকে ডিভোর্স করবো। এখন ভিডিও চ্যাট করছি, কয়দিন যাক ... দেখাও করবো। দেখা করে সবই করবো। সারা দুনিয়া জানবে যে তার বউ একটা হোর ... তোর মাসুদ ভাই হাড়ে হাড়ে টের পাবে সত্যিকারের হোর ওয়াইফ থাকলে কেমন লাগে ....

- এসব কি বলছিস!

- সত্যি বলছি। আই এ্যাম হ্যাভিং ফান মাই ওয়ে। তোর মাসুদ ভাই আমাকে মারে, আর আমি ওকে লুকিয়ে ইয়াং ছেলেদের সাথে ভিডিও চ্যাট করি। ঐপাশের ছেলেগুলো যখন আকুতি মিনতি করে আমাকে কাপড় খুলতে বলে, আমি কাপড় খুলে ভিডিও ক্যামেরার ক্যাবলের দাগ দেখাই ... হি হি হি ...

শারমিনের কথা ভাবলে সিফাতের অদ্ভূত একটা কষ্ট হয়। বুক কেঁপে ওঠে। গতকাল বাপ্পীর সাথে চ্যাটিং-এর সময়ও ওর শারমিনের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছিলো। সিফাত এসব ভাবতে ভাবতেই লিখলো, আমি কালকে আসবো। তোমার সাথে দেখা করবো। কিন্তু বইমেলায় আমি যেতে পারবো না।

- আচ্ছা। বইমেলায় যেতে হবে না। টিএসসিতে আসো। ছয়টায়। কিন্তু আমি তোমাকে চিনবো কিভাবে ? এক কাজ করো, গাঢ় নীল শাড়ি পরে আসো।

- আচ্ছা। গাঢ় নীল শাড়ি পরে আসবো।

সিফাত গাঢ় নীল শাড়ি পরে আসেনি। ওর শাড়ির রঙ কারও পক্ষে দেখাও সম্ভব না। বাসার বাইরে কোথাও গেলে সিফাতকে বোরকা পরতে হয়। কিন্তু ও আসাদকে সত্যি কথা বলেছে ... বলেছে শারমিনের সাথে বইমেলায় যাবে। বাচ্চাদের জন্য বই কিনবে। আসাদের রাজি হওয়ার কথা না। কি কারণে যেন আসাদ রাজি হলো। শুধু বললো, বোরকা পরে যাও। শারমিন ভাবী যেভাবেই যাক, তোমার চোখ ছাড়া যেন কিছু দেখা না যায়।

- বোরকা পরেই যাবো। আমি তো বাইরে গেলে বোরকা পরেই যাই।

আসাদ নরম স্বরে বললো, মা-বাবাকে কিছু বলার দরকার নাই ... চুপচাপ চলে যাও। তারা কিছু জানতে চাইলে বলবে শারমিন ভাবীর সাথে নিউমার্কেটে যাচ্ছো, কেনাকাটা আছে। আর বইমেলায় যখন যাচ্ছো তোমার নিজের জন্যেও বই কিনে এনো। তুমি তো বই পড়তে পছন্দ করো।

টিএসসিতে সিফাতকে রেখে শারমিন কোথাও চলে গেছে। বলেছে এক ঘন্টা পরে এখানেই আসবে। সিফাত কালো বোরকা পরে দাঁড়িয়ে আছে। এমন অবস্হায় বাপ্পীর ওকে চেনার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাপ্পীকে কখনও বোরকার কথা বলা হয়নি। ওকে এসএমএস করে বোরকার কথা বললে হয় তো পরিচয়টা সহজ হতো। কিন্তু কেন যেন সেটা করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

সিফাতের কাছাকাছি একটা তরুণ যুগল এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটার পরণে কমলা রঙের জামদানী শাড়ি, ছোট হাতার কালো ব্লাউজ। কপালে কালো টিপ। ছেলেটা নীল রঙের পান্জাবী পরেছে। ওরা খুব মিষ্টি করে কথা বলছে। ছেলেটা উদাস ভঙ্গীতে কি কি সব বলছে, আর মেয়েটার চোখেমুখে মুগ্ধতা নিয়ে সেসব শুনছে। একটু পর পর বলছে, এই তুমি আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো না, প্লিজ ...

বাপ্পীর এসএমএস এসেছে, ‘তুমি কোথায় ? নীল শাড়ির কাউকে তো দেখছি না ...’

সিফাত এসএমএস-এর উত্তর না দিয়ে সেই তরুণ যুগলের দিকে তাকালো। ওদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া লেগেছে। ছেলেটা বারবার বলছে, জান আমি তো বলছি আমি তোমার সাথে দেখা করতেই এসেছি .... তুমি কেন বারবার যুঁথির কথা বলছো ...

- আমি বলছি কারণ ঐ মেয়েটা এখনও তোমার ছবিতে লাইক দেয়, কি কি সব কমেন্ট দেয়। কেন তুমি ওকে আনফ্রেন্ড করছো না ...

- যুঁথির সাথে আমার কিছু নেই, ছিলোও না ... খামাখা কেন আমি ওকে আনফ্রেন্ড করবো ?

- তুমি মিথ্যা বলছো ... তুমি সারাজীবন আমাকে এভাবে কষ্ট দেবে ....

মেয়েটা সবাইকে উপেক্ষা করে ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়েই কাঁদছে। সিফাতের মনের ভেতরে কি যেন একটা হলো। বাপ্পীর কি এমন কেউ আছে ? এতোদিন কথা হয়েছে, অথচ বাপ্পীকে এটা কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি! শুধু নিজের শূন্যতার কথাই বলা হয়েছে। বাপ্পী নিজেও কখনও এমন কিছু বলেনি। বাইশ বছর বয়সের ছেলে, ওর কি এমন ভালোবাসার কেউ থাকতে পারে না ? যদি থাকে তাহলে সিফাতের কথা জেনে সেই মেয়েটাও নিশ্চই এভাবে কষ্ট পেয়ে কাঁদবে ...

বাপ্পীকে দেখা যাচ্ছে। কালো রঙের পান্জাবী পরেছে। ফেসবুকের ছবির চেয়েও বাচ্চা লাগছে ওকে। আরও সুপুরুষ লাগছে। বাপ্পী পার্কিং-এ দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সিফাত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আসাদ ওকে বোঝে না, তাই ও বাপ্পীর কাছে যায়। বাপ্পী ওর জন্য অন্য একটা মেয়েকে হয় তো কষ্ট দিচ্ছে, বা দেবে। এই সমীকরণগুলো এভাবে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ঠিক যেমন মাসুদ ভাই শারমিনকে যণ্ত্রণায় রেখেছে। যেমন এই ছেলেটা তার প্রিয়জনকে কাঁদাচ্ছে।

এসএমএস এসেছে। মোবাইল টি টি শব্দে লো চার্জের জানান দিচ্ছে, কিন্তু এসএমএস নোটিফিকেশনের শব্দও দিচ্ছে। সিফাত মোবাইল খুলে দেখলো আসাদ মেসেজ করেছে। ‘আমার জন্য কি কি বই আনবে ? আমি কিন্তু সেটার অপেক্ষায় থাকবো। সেই সাথে তোমার অপেক্ষায়ও থাকবো। মিস করছি তোমাকে। সাবধানে থেকো, আর তাড়াতাড়ি বাসায় এসে পড়ো প্লিজ’।

সিফাতের খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু একই সাথে খুব আনন্দও হচ্ছে। অনুভূতির এই মোহনাটা অচেনা। বাপ্পী ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। স্মার্ট ছেলে। নীল শাড়ি না দেখলেও বোরকা পরা এই নারীকে ও পরিচয় জিজ্ঞেস করবে। সিফাতের ধারণা ভুল না। বাপ্পী হালকা স্বরে বললো, এক্সকিউজ মি, তুমি কি সিফাত ?

টিএসসি আর তার চারপাশে অনেক শব্দ হচ্ছে। সন্ধ্যার আলো আধারিতে তারুণ্যের অনবদ্য দৃশ্য। সেই দৃশ্য আর সোরগোলের মধ্যেই সিফাত বাপ্পীকে দেখলো, আর কয়েক মুহূর্তের জন্য ওর তারুণ্যমাখা কণ্ঠে বলা ‘তুমি কি সিফাত ?’ কথাটায় হারিয়ে গেলো।

জীবনের এসব মুহূর্ত মায়াময় অনুভূতির মুহূর্ত। এদেরকে বেশী আপন করে পাওয়ার চেষ্টা করতে নেই। এরা আপন হলে প্রিয় অপ্রিয় সব সত্যগুলো হারিয়ে যাবে। জীবনের মিশালে এক বিন্দু মায়ার অনুভূতিকে মুঠো মুঠো সত্যের উপলব্ধি দিয়ে লেপে দিতে হয়। সেরকম না করলে সত্য আর মায়ার নিরন্তর যুদ্ধে জীবন বিষাদময় হয়ে যাবে। শারমিনের যেমনটা হয়েছে। সিফাতের জীবন শারমিনের হতভাগা জীবনের মতো না। সেরকম জীবন খোঁজার কোনো ইচ্ছেও ওর নেই।

সিফাত মোবাইল সুইচ অফ করে মাথা নেড়ে বললো, জ্বি না, আমি সিফাত নই। সরি।

বইমেলায় প্রচন্ড ভিড়। সিফাত এখন বোরকার নেকাব খুলে বইমেলায় ঘুরছে। একা একাই ঘুরছে। হাজার হাজার বই আর মানুষ। ঝলমলে স্টলের আলো, ঝকঝকে বইয়ের প্রচ্ছদ আর চকমকে মানুষের সাজ। সবার চোখেমুখে আনন্দ আর প্রাণ। বই আর প্রাণের সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া এখানে কারও কিছু করার নেই।

আধাঘন্টা ঘুরে সিফাত মাত্র একটা বই কিনতে পারলো। আসাদের জন্য একটা উপন্যাস। উপন্যাসটার নাম ‘রোদন-ভরা এ বসন্ত’।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ইমরানুল হক  বেলাল
    ইমরানুল হক বেলাল অসাধাৱণ একটি গল্প ।
    ভাষা প্ৰয়োগ বানান কোনো জায়গায় ভুল নেই।
    শুভ কামনা ৱইল।
    প্রত্যুত্তর . ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬
  • শরীফ উল্লাহ
    শরীফ উল্লাহ রোদন ভরা এ বসন্ত গল্পটি টাইপ সুন্দর না পড়লেই নয়। তাইতো পড়ছি আগ্রহ সহকারে। আপনার গল্প পড়তে জিব এ জল এসে পড়ে। গল্পগুলো মন্দ নয়। আরো গল্প হলে ভালো হতো। পাবো কি?
    প্রত্যুত্তর . ২৬ মে, ২০১৬
  • আহা রুবন
    আহা রুবন মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পাঠককে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাবার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে আপনার।
    প্রত্যুত্তর . ২ আগস্ট, ২০১৬