বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার

  • কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেবার দরকার নেই। দুই বাংলারই যে কয়েকজন কবি নিজগুণে ব্যাপক পরিচিত তাদের একজন তিনি। জন্মেছিলেন এই বঙ্গে। তবে প্রতিষ্ঠিত ওপার বাংলায়। ১৯৭৪ এ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ছাড়াও তারাশঙ্কর-স্মৃতি এবং আনন্দ শিরমণি পুরস্কার পান। ২০১১ তে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময় প্রথম আলোর সঙ্গে সাহিত্যসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ। আজ হঠাৎ সামনে পড়ে যাওয়ায় নয়ে আসলাম। আশা করছি নবীন কবিদের কাজে লাগবে।

     

    আলতাফ শাহনেওয়াজ: আপনি জন্মেছেন বাংলাদেশের ফরিদপুরের চান্দ্রা গ্রামে, ১৯২৪ সালে। শিক্ষাজীবনের শুরুও এখানে। অনেক ক্ষেত্রে শৈশব-শৈশবের পরিবেশ কবি-লেখকদের লেখালেখিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আপনার কবিজীবনের পটভূমি রচনায় চান্দ্রা গ্রামের কোনো ভূমিকা আছে কি?

     

    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী: আছে, অনেকখানিই আছে। আমার শৈশবের পুরোটাই কেটেছে পূর্ববঙ্গে, ঠাকুরদা আর ঠাকুমার কাছে। ঠাকুরদা কর্মজীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়। তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন যে কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানে রুজি-রোজগার, লেখাপড়া ইত্যাকার কারণে যেতে হয় কিন্তু ওখানে থাকতে নেই, থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ হলো গ্রাম। বলতেন, আসলে কোনো বড় শহরেই থাকতে হয় না। কারণ, বড় শহরে মানুষের ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ হয় না। এই কারণে কর্মজীবন শেষে ৫০ বছর বয়সে কলকাতার পাট চুকিয়ে ঠাকুরদা দেশের বাড়ি চান্দ্রা গ্রামে থিতু হয়েছিলেন। তবে আমার বাবা কলকাতাতেই থাকতেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, সেখানকার একটি কলেজে ভাইস প্রিন্সিপালও ছিলেন। ফলে কলকাতায় আমাদের একটা বাসাবাড়ি রাখতেই হতো, কোনো উপায় ছিল না। আমার যখন দুই বছর বয়স, আমার মা তখন বাবার কাছে চলে এলেন, কলকাতায়। মা ভেবেছিলেন আমায় নিয়েই কলকাতা যাবেন। কিন্তু ঠাকুরদা-ঠাকুমা ছাড়লেন না আমাকে, তাঁদের সঙ্গে গ্রামেই রইলাম আমি। আমার ঠাকুরদার নাম লোকনাথ চক্রবর্তী। আমরা সবাই নাথ। তাই আমি মজা করে বলি, আমি নাথ বংশের শেষ কবি—রবীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ তার পরেই তো নীরেন্দ্রনাথ, তাই না? তো, যা বলছিলাম, আমার ডাকনাম খোকা। মা মাঝেমধ্যেই আমাকে কলকাতায় পাঠানোর জন্য কান্নাকাটি করে ঠাকুমাকে চিঠি লিখতেন যে খোকাকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। তবে গ্রামে আমার ছিল মহা স্বাধীনতা—ইচ্ছেমতো দৌড়ঝাঁপ করছি, যখন তখন গাছে উঠছি; গ্রামে আপন মনে নিজের মতো করে বেড়ে উঠছি। তাই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আসার কোনো ইচ্ছে আমারও ছিল না। এসবই কবি হিসেবে আমাকে তৈরি করেছে। বলতে গেলে এখনো শৈশবকে ভাঙিয়েই লিখে যাচ্ছি আমি। যে কয়েক বছর গ্রামে ছিলাম দেখেছি কখন ধান ওঠে, কীভাবে সেই ধানে মলন দিতে হয়। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, পূর্ববঙ্গে কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করতে হয় না, এটা আপনাতেই তৈরি হয়; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বীজতলা বানাতে হয়। সব মিলিয়ে জীবন-সায়াহ্নে পৌঁছে আজ বলতে চাই, এ জীবনে যা লিখছি, তার পেছনে শৈশবের অবদান অসামান্য। তবে ঠাকুরদার মৃত্যুর পর গ্রাম ছেড়ে আমি কলকাতায় চলে এলাম। খুব কষ্ট হয়েছিল সে সময়।

     

    আলতাফ: আপনার কবিতা লেখার শুরু কি গ্রামেই, ঠিক কোন বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করলেন আপনি?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: আমার বয়স তখন চার বছর। গ্রামে আমার বড় কাকিমা থাকতেন। একদিন সারা বেলা হুটোপুটি করে সন্ধ্যারাতে বাড়ি ফিরে তাঁকে বললাম—রাত হলো, ভাত দাও। আমার কথা শুনে কাকিমা বললেন, তুই তো দেখছি কবিদের মতোন কথা বলছিস! আসলে কবিদের মতোন কথা মানে কী? আমি সেদিন যে কথাটি বলেছিলাম, পরে মনে হয়েছে এর মধ্যে সেভাবে অন্ত্যমিল ছিল না। কেবল ‘রাত’ আর ‘ভাত’ বলে দুটি কথা—তার ভেতরে যে মিল, সেটা তো প্রথাগত কোনো অন্ত্যমিল নয়। কিন্তু তাতেই আমার কাকিমার মনে হয়েছিল, ছেলেটা কবিদের মতো কথা বলছে। এভাবেই শুরু। আবার ছোটবেলায় গ্রামে কবিয়ালরা আসত, কবিগানের আসর বসতো—রামায়ণ গান হতো, আর হতো গুনাই বিবির গান—এগুলো সব আমার মুখস্থ ছিল। তারপর গ্রামের ছেলেপুলেরা এসে গাইত, ‘আইলামরে হরণে/ লক্ষ্মীদেবীর চরণে/ লক্ষ্মীদেবী দিলেন বর/ চাল কড়ি বার কর/ চাল কড়ি রামরে/ সোনা ডাঙা থামরে।’—এই যে গ্রামীণ মানুষের মুখে মুখে শোনা গানের চরণ; মনে হয় এগুলোই আমার কবিজীবনের পটভূমিকা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

     

    আলতাফ: গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে আপনারা যখন লিখতে শুরু করলেন, বাংলা সাহিত্যের একপাশে সে সময় রবীন্দ্রনাথ, অন্যদিকে তিরিশের আধুনিক কবিরা—দুই জগৎ, দুই ভাষা। এই দুই জগৎ ও ভাষার বিপরীতে নিজের কাব্যভাষা তৈরির ক্ষেত্রে আপনার বিবেচনাগুলো কেমন ছিল?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: আমি কখনো এত কিছু ভাবিনি, সব সময় নিজের মতো করে লিখেছি। আমার কল্পনাশক্তি কম। কবিতার কল্পনালতা বলে যে কথাটি আছে, ওতে আমার বিশ্বাস নেই। আমি চারপাশের মানুষ দেখি, তাদের জগৎ-সংসার ও জীবন দেখি। এভাবেই আমার কাব্যভাষা তৈরি হয়েছে। সত্য কথা হলো, কবিতা লেখার জন্য আমার কিছু কল্পনা করতে হয় না, যা দেখি তা থেকেই লিখতে পারি।


    আলতাফ: তাহলে কি কবিতায় কল্পনার দরকার নেই?


    নীরেন্দ্রনাথ: আমার দরকার নেই। অন্যদের দরকার হলেও হতে পারে। শোনো, ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতাটি যখন লিখলাম, তারও বহু আগে আমি ঠাকুমার মুখে এর গল্পটি শুনেছিলাম। জেনেছিলাম যে কোনো এক রাজাকে এক শিশু বলছে, রাজা তুমি তো উলঙ্গ। পরে জেনেছি এটা হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের গল্প। আসলে বিভিন্ন দেশে এ গল্পের অনেক ভার্সন আছে। গল্পটি আমার ভেতরে অনেক দিন ছিল। একসময় চারপাশের নানা অনাচার দেখে আইডিয়াটা এল। লিখলাম ‘উলঙ্গ রাজা’—‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’

     

    আলতাফ: কবিতা লেখা আপনার কাছে কি তবে সচেতন প্রয়াস? অনেকে যে বলেন, কবিতা আমি লিখি না, কেউ আমাকে দিয়ে লেখায়—এ ব্যাপারে কী বলবেন?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: অন্যের কথা জানি না। তবে আমার মনে হয়, সব লেখাই সচেতন প্রয়াস। আমার হয় কী, হয়তো একটা ঘটনা দেখলাম, সেটি মাথার মধ্যে গেঁথে রইল। অনেক দিন বাদে হঠাৎ কোনো এক দুপুরে হয়তো মনে পড়ল ঘটনাটি। এরপর লিখতে বসলাম। আর লেখার সঙ্গে সঙ্গে যে ভাবনাগুলো আমার মাথায় জড়ো হয়ে ছিল, ওই ভাবনার হাত থেকেও মুক্তি পেলাম। যতক্ষণ না লিখছি ততক্ষণ মুক্তি নেই, বুঝেছ? আমার ‘জঙ্গলে এক উন্মাদিনী’ কবিতাটি লেখার পেছনেও একটা ঘটনা আছে। এটি লিখেছিলাম ঘটনা ঘটার ২৫ বছর বাদে। আমাদের পাড়ায় এক পাগলি থাকত। এই পাগলিকে কেউ ছাড়েনি। একদিন এক বাড়ির বারান্দায় একটা বাচ্চা প্রসব করে সে। তখন লোকেরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করত। একপর্যায়ে ওই লোকদের লক্ষ করে ঢিল ছোড়ে সে; বলে যে বাবুরা, অত ঠাট্টা ইয়ার্কি কোরো না। তোমাদের এই কলকাতা নামের জঙ্গল বাঘ-সিংহীতে বোঝাই। এখানে একটা পাগলিরও নিষ্কৃতি নেই। এই ঘটনার ২৫ বছর পর একদিন বাজারে গেছি। মাছের দাম করছি। মাছের দাম তখন প্রচণ্ড। এর মধ্যে একজন বললেন, এত দাম হলে মানুষ খাবে কী, পাগল হয়ে যাবে। তাঁর কথা শুনে পাশের আরেকজন বললেন, পাগল হয়ে যেতে পারেন, তাতেও নিষ্কৃতি মিলবে না। খেয়ে তো বাঁচতে হবে। এই যে মাছের বাজারে লোকগুলো কথা বললেন, আমার কিন্তু মনে পড়ে গেল ২৫ বছর আগে শোনা পাগলির সেই কথাটি—কলকাতা নামের জঙ্গলে একটা পাগলিরও নিষ্কৃতি নেই। রাতে বাড়ি ফিরেই লিখলাম কবিতাটি। আসলে এই কবিতা কিন্তু পাগলিই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিল। না লেখা পর্যন্ত সে আমার ঘাড় থেকে নামেনি।

     

    আলতাফ: ‘অমলকান্তি’ আপনার জনপ্রিয় কবিতার একটি। অমলকান্তি কি বাস্তব কোনো চরিত্র?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: এই কবিতার ঘটনাটিও বাস্তব। অমলকান্তি আমার বন্ধু, খুবই গরিব ঘরের ছেলে ছিল। বস্তিতে থাকত। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। একদিন খেলা শেষে বন্ধুরা মিলে গড়ের মাঠে বসে কে কী হতে চাই—তা নিয়ে কথা বলছিলাম। কেউ বলল, ডাক্তার হবে। কেউ উকিল, কেউ বা মাস্টার। অমলকান্তিকে বললাম, তুই কী হবি? অমলকান্তি বলল, আমি রোদ্দুর হব। ওর কথাটি আমার মাথায় ছিল। পরে লিখলাম কবিতাটি। কবিতাটি আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ অন্ধকার বারান্দায় আছে। আচ্ছা, বলো তো অমলকান্তি কেন রোদ্দুর হতে চায়? কারণ, ঘিঞ্জি বস্তিবাড়িতে থাকার ফলে সে রোদ্দুর পায় না। তাই সে নিজেই রোদ্দুর হয়ে যেতে চেয়েছে।

     

    আলতাফ: আপনার অধিকাংশ কবিতা সমাজ-বাস্তবতানির্ভর। কবিতায় এক ধরনের বিবৃতি বা বক্তব্য প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা আছে। আপনি কি মনে করেন কবিতার মাধ্যমে সমাজ বদল বা এ রকম কিছু সম্ভব?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: না না, কবি একা কিছু করতে পারে না। কবিতার মধ্য দিয়ে একটা কাজই সে পারে—কবি যে সময়ের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে, জীবন কাটায় এবং যে সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়; লেখার ভেতরে তার একটা ব্যাখ্যা দিতে চাই সে। একটা ইন্টারপ্রিটেশন তাকে দিতেই হয়, না হলে তার মুক্তি নেই।

     

    আলতাফ: জীবনানন্দ দাশের কবিতা প্রসঙ্গে আপনি লিখেছিলেন, ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’র কথা। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আপনার বচসাও হয়েছিল শোনা যায়...

     

    নীরেন্দ্রনাথ: না, ঠিক বচসা নয়। ২১ বছর বয়সে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা প্রসঙ্গে ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’ কথাটি লিখেছিলাম। পরে পূর্বাশা পত্রিকায় এর জবাবও দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। সেখানে তিনি লিখলেন, না, আমার ভেতরে কোনো আত্মঘাতী ক্লান্তি নেই। তবে পাছে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়ে এ আশঙ্কায় তখন ওঁর কথার কোনো উত্তর দিইনি। কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করি একটা ভয়ংকর রকমের আত্মঘাতী ক্লান্তি আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে তাঁকে। ‘আরও এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/ খেলা করে;/ আমাদের ক্লান্ত করে/ ক্লান্ত—ক্লান্ত করে;/ লাশকাটা ঘরে/ সেই ক্লান্তি নাই;/ তাই/ লাশকাটা ঘরে/ চিত হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।’—এই চরণগুলোর ভেতরে কি ক্লান্তি নেই? জীবনানন্দের জীবন সুখের ছিল না। এবং আমি জানতাম একটা আত্মঘাতী ক্লান্তি ওঁর মধ্যে কাজ করে। পরে অবশ্য তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথাও হয়েছিল। ’৪৬-এর দাঙ্গা-পরবর্তী সময়ের ঘটনা এটা। আমরা সে সময় একসঙ্গে স্বরাজ নামে একটি পত্রিকায় কাজ করি। আমি নিউজে আর তিনি ছিলেন সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে। তিনি ছিলেন মানে সাহিত্য বিভাগে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তখন তাঁকে বলেছিলাম, কোনো লোকের মধ্যে আত্মঘাতী ক্লান্তি থাকলে ক্ষতিটা কী? এটা নিয়ে কি মহৎ কবিতা হয় না? আপনি এই কথায় এত ঘাবড়ে গেলেন কেন? আমার কথা শুনে একেবারে চুপ হয়ে গেলেন জীবনানন্দ। আসলে তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন।

     

    আলতাফ: অনেকেই বলেন যে কবিতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আপনার উত্তরাধিকার বহন করেছেন এবং সুনীলের গড়ে ওঠার পেছনে আপনার একটা ভূমিকা আছে...

     

    নীরেন্দ্রনাথ: দেখো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভাকে ঘষে পিটে তৈরি করার দরকার হয় না। হ্যাঁ, ওর মৃত্যুর পর অনেকে বলেছেন যে সুনীলের আসল মেন্টর হচ্ছে নীরেন্দ্রনাথ। কথাটা কিন্তু ঠিক নয়। নিজগুণেই সুনীল বড় কবি। ওর কোনো মেন্টরের দরকার হয় না। সুনীল প্রসঙ্গে আমি শুধু এটুকু বলি যে একটা চারাগাছকে ধীরে ধীরে বিশাল মহিরুহ হতে দেখলাম। সেই মহিরুহের বিস্তর ডালপালা। কত লোককে সে আশ্রয় দিল—অনেক ভাগ্য করে এসেছিলাম বলে এই দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পেয়েছি। সুনীলের মৃত্যুর পর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের তরুণ কবিরা। কলকাতায় এখন আর একজনও নেই যিনি তরুণ কবিদের কবিতার ভালোমন্দ বিচারের পাশাপাশি কবির ঘরে রাতের খাবার আছে কি না, সে ব্যাপারে খোঁজ নেবেন। সুনীল সম্পর্কে একটা কথা বলি, ওর মতো রেঞ্জ আর কারও নেই। যত বিষয়ের ওপর ওর হাত গেছে, আর কোনো কবির হাত অদ্দুর পর্যন্ত যায়নি।

     

    আলতাফ: বাংলাদেশে কাদের কবিতা ভালো লাগে আপনার?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: আল মাহমুদ। অসম্ভব ভালো কবি তিনি। যদিও তাঁর সঙ্গে আমার মত মেলে না। তাতে কী, ‘একবার পাখিদের ভাষা যদি শেখাতেন সোলেমান পয়গম্বর’—এ রকম চরণ যিনি লিখতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই অত্যন্ত মূল্যবান কবি। তাঁর মতামত যা খুশি তা-ই হোক, সেসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকও ভালো কবি। এ ছাড়া অনেক আগে বাংলা একাডেমিতে বসে একটা বাচ্চা ছেলের কবিতা শুনেছিলাম। অল্প বয়সে মারা গেছে সে—আবুল হাসান; ও যে কী ভালো কবি!

     

    আলতাফ: অনেক তরুণ কবির ছন্দে হাতেখড়ি হয় আপনার কবিতার ক্লাস পড়ে। বই পড়ে কি ছন্দ শেখা সম্ভব?

     

    নীরেন্দ্রনাথ: ছন্দ আসলে সব কিছুতেই আছে। একটা লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে—এর মধ্যে যেমন ছন্দ আছে, তেমনি পাথরে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পা টলে গেল যার—তারও একটা ছন্দ আছে। কথা হলো, প্রথাগত ছন্দটা জেনে রাখা ভালো। কিন্তু এর দাসবৃত্তি করা ভালো নয়। বই পড়তে হবে ছন্দ সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়ার জন্য। তবে শিখতে হবে নিজের মতো করে। আর ছন্দ শেখার পর ওটা ভুলে যেতে হবে। ছন্দ কাজ করবে ভেতরে ভেতরে, অত স্পষ্টভাবে তাকে টানার দরকার নেই।