বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭০

চুপকথা

  •  

    বৃষ্টিস্নাত সকাল। বাসে সফর করছে অনি। পুরা নাম অনিরুদ্ধ হাওলাদার। সংসারে অনিকে আদরে বরণ করে রুদ্ধকে যখন অনাদরের আদাড়েনিক্ষেপ করা হয় তখন পূর্ণরূপে রূপায়িত হয় ‘অনি’। বর্তমানে তাকে ‘অনিরুদ্ধ’ বললে বান্ধবমহলেও চেনা দায়। চালকের পিছনাসনে আসীন। রঙিন চশমা পরে আছে চোখে। না না--একেবারে রঙিন বলা সমীচীন হবে না, কালোর উপর ঘোলাটে ধূসর। বাইর থেকে চোখদুটো দেখার কোন সুযোগ নেই। স্টপ স্টপে যাত্রী উঠানামা চলছে। শ্রাবণের মাঝামাঝি সময়। এ সময়টাতে বৃষ্টির উপর আস্থা রাখা যায় না, যখন তখন বর্ষণমুখর হয়ে উঠতে পারে--কখনো প্রবলাকারে মুষলধারে, কখনোবা মৃদু মৃদু থেমে থেমে। বর্তমানে আকাশের রঙ ফর্সা, তবু গুটিগুটি বৃষ্টিফোঁটা ঝরছে অজস্র। সাদা এপ্রন পরা একটি মেয়ে উঠে বসল চালকাসন ঘেঁষে অনির হাঁটুদুটো স্পর্শ করে একেবারে তার সম্মুখে। বৃষ্টিভেজা তরুণীর অবয়বে ফুটে উঠেছে অপ্সরারূপ! আপ্লুত চুলের গুচ্ছ বেয়ে ‘টপ’ ‘টপ’ করে ঝরে পড়ছে স্বচ্ছ জলের ফোঁটা। ললনার এক হাতে কিছু বইখাতা অন্য হাতে একটা পরিষ্কার চশমা ও সামান্য একটা লেখনী। সহজে বুঝা যাচ্ছে কোনেক কলেজছাত্রী, রওনা হয়েছে শিক্ষার্জনে। পাশে বসা যাত্রিণীর সঙ্গে টুকটাক আলাপে শোনা গেল, ছাতাটা কখন যে চোখে ধুলো দিয়ে উধাও হয়ে গেল টের পাওয়া গেল না। অপর দিক থেকে উপদেশ মিলল, ছাতাটাকে আঁকড়ে রাখতে হয়, বিশেষ করে বর্ষার দিনে; নাহয় ত যথেষ্ট রক্ষিত স্থানেও তার সুরক্ষা মুশকিল।

    গাড়ির হেলনেদোলনে যাত্রীরা টালমাটাল। চালকের ব্র্যাক কষাকষিতে সুদর্শনার হাঁটুদুটো অনির হাঁটুদুটোকে বারবার স্পর্শ করছে। কচুলতা খেলে যেমনভাবে চুলকে উঠে গলা তেমনভাবে সুড়সুড়ি হচ্ছে অনির হাঁটুদুটোতে। তবে কচুলতার চুলকে উঠাকে অম্ল খেয়ে দমন করা যায় কিন্তু মনের চুলকে উঠাকে? এই ত আর অম্ল খেয়ে দমন করা যায় না। এমন মুহূর্তে মনের অনুভূতি কী হতে পারে পাঠকগণ ছাড়া লেখকের বুঝার সাধ্যাতীত। মাঝে মাঝে কেবল আড়চোখে চক্ষুবিনিময় হচ্ছে দুয়ের। একে অপরের দিকে মুগ্ধচোখে তাকাচ্ছে বারবার। অনির পাশের সিটে বসা একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক, ভদ্রলোক জানালার ফাঁক দিয়ে বারবার বাইরে তাকাচ্ছে। এসব তাঁর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না। এমন সময় চালকের এক অকল্পনীয় কাণ্ডকে অনেকে মন্দ বললেও অনির জন্যে শুভক্ষণ, একেবারে প্রভুর দয়া বলতে হয়! ঘটেছে কী? কৌতূহলী অনেকে--নিরীহ এক কুকুরকে বাঁচাতে চালক সজোরে ব্র্যাক কষলে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে অসতর্ক যাত্রীগণে। সেই ধাক্কার চোটে অনি মেয়েটির বুকে ঝুঁকে পড়লে শরমে হতবিহ্বল দুজন। অনি ‘দুঃখিত’ ‘দুঃখিত’ বলে দুঃখপ্রকাশ করলে লজ্জানতমুখে মেয়েটি ‘স্বাভাবিক’ বলে মিটিমিটি হাসে। তারপর কিছুদূর এসে একটা স্টপে মেয়েটি গাড়ি থেকে নেমে যায় এবং পশ্চিমের একটা গাছগাছালিভরপুর নিরিবিলি পথ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। যেতে যেতে বারবার পিছন ফিরে তাকায়। অনিও চোখের চশমাটা মাথায় তুলে যতদূর মনোরমাকে দেখা যাচ্ছে ততদূর জানালার ফাঁক দিয়ে অপলকে চেয়ে আছে। অনি যাচ্ছে শহর থেকে বাড়ি কিন্তু দিশেহারা মন তার এমুহূর্তে হারিয়ে যায় কল্পনার ঝিলমিল রঙের জগতে।


    আজকাল কোন কাজেই মন বসছে না অনির, মনটা কেবল ধায় ধায় করছে। এমনকি খাওয়াদাওয়াতে পর্যন্ত কোন রুচি নেই। ডিউটিতে বলকিছুটিতে যেখানে যাচ্ছে উদাসীনতা পিছু ছাড়ছে না। সহকর্মী বন্ধুদের কেউ জিজ্ঞেস করলে ম্লান হেসে বলছে, দুর, কিছুনা। আগে ছুটিতে বাড়ি আসলে সারা দিনের মধ্যে এক ঘণ্টা ঘরে পাওয়া দায়। বন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব আর দাবা তাস ক্রেরামের আড্ডায় কেটে যেত দিন। মা ছেলের সঙ্গে একটু সুখদুঃখের কথা বলবে তাও কোন বারে সহজ হয়ে উঠত না। বর্তমানে বলতে গেলে এক ধাক্কায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে! একজন মন্দ মানুষ যদি এভাবে পরিবর্তন হয়ে যেতে পারত। বরং পারবে না বলেও কোন কথা নেই। এখানে আমরা সবকিছু ভাগ্যলিপির উপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতি নই। এখানে আমরা মনের উপর সমস্ত কিছুর জোর দিব। একজন মানুষ যদি চায় মহাপুরুষ হতে পারে, সাধনাবলে একদিন ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং নিজেকে বাদশাহি তখ্‌তে বসাতে পারে। আবার যদি চায় খুব নগণ্য মনের পরিচয় দিতে পারে এবং পলকে অমানুষে পরিণত হতে পারে। সব মানুষেরই মনের উপর নির্ভর এবং সব মানুষেরই মনের খেয়াল। সুতরাং নাম ক্ষুণ্ন করা অতি সহজ কিন্তু সুনাম অর্জন করা খুব কঠিন। এমন প্রেম সুনাম অর্জন করতে আমরা কখনো দেখিনি।

     

    অনির পরিবর্তন অনেককে অবাক করে। ইদানীং বাড়ি এলে দরজা-জানালা বন্ধ করে সারা দিন নিজের রুমে বন্দি! কী করে বুঝে আসে না কারও। আগে যেছেলে মাসে-দু-মাসে একবার বাড়ি আসা দূরে থাক, চার-ছয় মাসও অনেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে খবর নেই; সেখানে আজকাল সাপ্তাহিক যাতায়াত করতে লাগল! এমন পরিবর্তন শুধু বন্ধুদেরকে নয় শত্রুকেও অবাক করে। যেখানে যাচ্ছে অপরিচিতার অবয়ব ছাড়া অন্য কিছু কল্পনায় আসছে না। ভাবনায় কেবল তারই হাস্যোজ্জ্বল সুবর্ণ মুখটা ভেসে ভেসে উঠছে বারবার। এটাকে পাঠকপাঠিকারা পাগলামি বললেও আমাদের সূক্ষ্ম বিচারে তা পাগলামি নয়...

     

    অনি সদ্য বিএ পাশ করা একজন কর্মিষ্ঠ যুবক। শহরের বিখ্যাত একটি পোশাক-রপ্তানি-কোম্পানির উচ্চপদস্থ কেরানি। মাসিক বেতন চৌদ্দ হাজার। সংসারে মা আর ছোট্ট একটি বোন। শহর থেকে গ্রামের দূরত্বটা একান্নকিবায়ান্ন মাইল। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার বাড়িতে আসাযাওয়া হয়েছে, মেয়েটির সাক্ষাৎ মিলে না। এখানে অনি কেন, কথাটা এভাবে যেকেউ মনে করা যৌক্তিক, পথের দেখা কে কবে মনে রাখে--হয়ত মেয়েটি ওখানেই ভুলে গেল সব। কিন্তু না, ঘটে তার বিপরীত। আরেকদিন বর্ষামৌসুমটা যায় যায়, হঠাৎ কাঠফাটা রোদ বের হয়েছে আকাশ বিঁধ করে; অনি যাচ্ছে বাড়ি, মেয়েটি উঠল গাড়িতে। নারী-আসন থেকে পুরুষাসন পর্যন্ত কোথাও একখণ্ড জায়গা খালি নেই যে, দুদণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে দাঁড়ায়। অনি মনে করল, এরকম অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে ঠেলাঠেলি করে একজন যাত্রিণী সিট ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকবে! এটা যেকোন সভ্য দেশের জন্য অসভ্যব্যাপার এবং জঘন্য বিষয়ও বটে। এমন অসৌষ্ঠব অশিষ্টতাকে যারা আস্বাদ মনে করে তারা বর্বর--মনুষ্যনামের কলঙ্ক। আর নারীকে যারা শ্রদ্ধা করে না তারা পুরুষনামেরও কলঙ্ক। একটুপর অনির চোখাচোখি হয় মেয়েটির--মনকাড়া হাসি হেসে বলল, আপনি! প্রতীক্ষিত অনি মৃদু হেসে তক্ষুনি আসন ছেড়ে দিল এবং মনোহারিণীকে অই আসনে বসার আমন্ত্রণ জানাল। মেয়েটি মুচকি হেসে আপত্তিকণ্ঠে ধন্যবাদ জানায় এবং চোখের ইঙ্গিতে বুঝায় যথাস্থানে ঠিক আছে। কিন্তু অনির বিনয়ী আবেদন...

     

    অনি দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটির পাশে। সত্তর কি আশি কিলোমিটার বেগে ছুটে চলছে গাড়িটি। চালকের ব্র্যাক কষাকষিতে হেলেদোলে বারবার স্থির হচ্ছে দাঁড়ানো যাত্রীরা। মেয়েটি আড়চোখে বারবার অনির দিকে তাকাচ্ছে...অনিও বারবার...পরস্পর পরস্পরকে সঙ্কোচ করছে। লজ্জায় একে অপরকে কিছুই বলতে পারছে না। আড়াআড়িভাবে দুজন দুজনাকে আকৃষ্টচোখে চাচ্ছে। উভয়ের সঙ্কোচিত চোখেমুখে ফুটে ওঠছে অনুরাগের ভাব। চালক কি কারণে আবার সজোরে ব্র্যাক কষল--টালমাটাল যাত্রীগণ পড়ার উপক্রম হল। মেয়েটি অনির হাত ধরে টেনে স্থির করল। অনি হেসে বলল, ধন্যবাদ। লজ্জালাল মেয়েটি মাথা নিচু করে একটু হাসল এবং উত্তরে কিছু বলল না। রোদ্রাকাশে হঠাৎ বজ্রসঙ্কেত--কেয়ামতের অন্ধকার হয়ে তুফানবেগে ছুটছে বাতাস। গাছপালা ভেঙে চুরমার করে সম্ভবত এক্ষুনি মাটিতে পাতবে আসন। যাত্রীরা চালককে বারবার সতর্কবার্তা শুনাচ্ছে--গাড়ির গতি যাতে কমায়, প্রয়োজনে কোথাও যেন দাঁড় করায়; আকাশের পরিণতি কী বুঝা যাচ্ছে না। তারপর ধীরে ধীরে বাতাসের গতি কমে এল। মেয়েটির গন্তব্য এল। আসমানে এখনো ভাসছে কালো মেঘের ভেলা--একটু পরপর বজ্রগর্জন। অনিকে নেমে আসার আভাস দিয়ে মেয়েটি হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। অনির হৃদস্পন্দন শত বেগে বেড়ে চলল! মিরের হাট যাত্রীছাউনি থেকে আধ মাইল পশ্চিমে মেয়েটির কলেজ, নিয়মিত পায়ে হেঁটে গমনাগমন করতে হয় এটুকু পথ। রাস্তাটা প্রায়ই নির্জন, পথিকের চলাচল তেমন একটা চোখে পড়ে না। কারণ কলেজপড়ুয়াদের সুবিধার্থে এ রাস্তার উৎপত্তি এবং কলেজগেইটে এসেই তার যাত্রাশেষ। এ নিরিবিলি পথটা অনেক শিক্ষার্থীদের জন্যে সংক্ষিপ্ত হলেও কিন্তু শিক্ষার্থিনীদের জন্যে মোটেও নিরাপদ নয়। জনবহুল বড় রাস্তা ধরে এলে এসব ছাত্রছাত্রীদের অনেকটা ঘুরে আসতে হয়। তাই এ সংক্ষিপ্ত পথটাই ছাত্রছাত্রীদের পছন্দের আগে।

     

    দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। আলাপাদি টুকটাক চলছে। তবে কী কথোপকথন হচ্ছে তা শুনা যাচ্ছে না। কাঠের কৃত্রিম পায়ে ভর দিয়ে একজন পঙ্গুভিক্ষুক পাশ কেটে চলে যেতেই অনি ভিক্ষুকের হাতে পাঁচটা টাকা গুজে দিল--ভিখারি যেন পৃথিবী পেল। এমন সময় ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এল। সামনে দেখা যাচ্ছে জীর্ণ বেড়ার পরিত্যক্ত একটা টিনের চৌচালা ঘর। বুঝা যাচ্ছে দোকানঘর। সম্ভবত কোনেকসময় চা-রুটির দোকান ছিল। অনি আর মেয়েটি দৌড়ে এসে দোকানটাতে আশ্রয় নিল--মনে হল সাপের ঘাঁটি। কত বছর ধরে ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে বুঝার উপায় নেই। বায়ুকোণে মস্ত একটি বটগাছ। দোকানটা হেলে গিয়ে গাছটির গায়ে ঠেস দিয়ে কবে হতে দাঁড়িয়ে আছে কে জানে। এ গাছই আজ দোকানটার বড় সহায়ক। মাকড়সা বুনেছে যেখানে-সেখানে বাসা। উইপোকা গড়ে তুলেছে ঢিপি। ইঁদুর খোঁড়েছে অসংখ্য গর্ত। নৈর্ঋতকোণে বড়ই শান্তিতে ঘুমাচ্ছে একটি কুকুর। ঈশানকোণে দুটো বাচ্চা নিয়ে লোটে আছে একটি ছাগি। বৃষ্টি হচ্ছে দেদারচে, এক-একটি ফোঁটা যেন তার এক-একটি পাটকেল। একটুপর শুনা গেল ভনভন শব্দ। দেখা গেল, ঘুণপোকায় আক্রান্তছাদের ভাঙা খুঁটিতে মস্ত একটা মৌচাকের। মৌচাকটা দেখে শুধু একজন মৌয়ালই নয়, যেকোন সাধারণ মানুষও খুশি হবে এবং আশ্চর্য অনুভব করবে। অনিও আশ্চর্য অনুভব করল--বলল, সম্ভবত এখনো কোন মানুষের নজরে আসেনি।
    মেয়েটি বলল, হয়তবা। তবে যার ভাগ্যে আছে, এটা সুনির্দিষ্টভাবে লিখা থাকে কিন্তু : সে অবশ্য ভাগ্যবান--ভাগ্যিস...
    মধুর প্রতি ললনার আগ্রহ দেখে অনিও আগ্রহী দেখাল--বলল, আপনার ভাল লাগে? আমার কিন্তু অত্যন্ত...
    মেয়েটি চমৎকৃত হয়ে বলল, বা রে! লাগবে না মানে, মধু কারনা ভাল লাগে বলুন? এটা একটা মহৌষুধও বটে। আমরা আসলে জানি না, মৌমাছিদের হত্যা করে আমাদের কি ক্ষতিই না আমরা করছি। ডাইনোসরদের মতো মৌমাছিরাও হয়ত একদিন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবে! তারপর আমাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে কয়দিন টিকে থাকবে জানি না। মৌমাছিদের রক্ষা করা আসলে মধুসংক্রান্ত ব্যাপারই নয়, পৃথিবীতে আমাদের টিকিয়ে থাকার একান্ত প্রচেষ্টাও বটে।
    একথা শোনে অনি মনে মনে আশ্চর্য বোধ করল এবং রসিকতা করে বলল, তাই নাকি! অনেক কিছু জানেন দেখছি।
    মেয়েটি বলল, অনেক কিছু জানি না, তবে মধুর কার্যকরটা কিছুটা জানি আরকি। এটাকে নিয়ে এখনো বোধহয় তেমন একটা রিসার্চ হচ্ছে না কোথাও। তবে অনেক গবেষণা হওয়া দরকার। কারণ মধুতে নাকি অনেক গুণ আছে, বিশেষ করে মানুষের উপকারিতা।
    অনি রসিকতার হাসি হেসে বলল, এত দিন জানতেম মধুর প্রতি দুর্বলতা কেবল পুরুষেরই আছে; আজ জেনেছি মেয়েদের দুর্বলতার কথা!
    মেয়েটিও ঠাট্টার ছলে হাসল--বলল, দুর্বলতা! আকর্ষণ কেন নয়?
    অনি হেসে বলল, যে জিনিসকে মানুষ মরিয়া হয়ে চায় সেই জিনিসের কাছে সে সব সময় দুর্বল এবং আকর্ষণীয়তার বিপরীত দিক হচ্ছে দুর্বলতা।
    মেয়েটি বলল, গুপ্তধনের প্রতি সকলের যেমন একটা টান--এও ত একপ্রকারের গুপ্তধন।
    মেয়েটির কথায় অনি আবেগপ্রবণ--বলল, গুপ্তধনের সন্ধান যখন অনায়াসে মিলেছে তা হলে আর দেরি কেন...
    মেয়েটি আশ্চর্যগলায় বলল--না না, আপনি একাজ করতে যাবেন না; একাজ খুব কঠিন, একাজে কত কৌশল আর দক্ষতার দরকার আপনার জানা আছে?
    অনি খুব হাসল--বলল, জানব না মানে, খুব জানা আছে--কঠিনকে সহজ করা অনির বাঁ হাতের খেলা...
    অনির দুষ্টামিভাব দেখে মেয়েটি করুণাময়ী হল--অনুরোধ করে বলল, দোহাই, থাকতে দিননা ওদেরকে আরামে। কারও ক্ষতি করে আনন্দলাভ করা মনুষ্যত্বের খেলাপ। আমাদের একটু আনন্দে ওদের বিরাট ক্ষতি হতে পারে। সৃষ্টির সমস্ত কিছু মানুষের উপকারে আসে সুতরাং মানুষ কি কখনো এসবের উপকারে আসে?

     

    ইতোমধ্যেদুজনের আলাপেরমধ্যে নাম জানাজানির বিষয়কে ধারণ করে অন্যান্য কথোপকথনকে নগণ্য হিসাবে বাদ দিব আমরা। মেয়েটির ডাকনাম বর্ষা। ভাল নাম অর্পিতা দেবী। হিন্দুসম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণতনয়া। ‘বর্ষা’ নাম শুনে অনি মোটেও চমকিত হননি, কারণ বর্তমানে সব গোত্রে এ নামের ছড়াছড়ি। তবে ‘অনিরুদ্ধ’ নাম শুনে বর্ষা দ্বিধান্বিত হয়, কারণ এ নাম এখনো বোধহয় একটা সীমারেখার গণ্ডি পার হয়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি। অনি মুসলিম জেনে বর্ষা অবাক হল!

     

    ভাল লাগার বিষয় যেখানে প্রেমের প্রধান্য সেখানে। অনেক কথা দুজনাতে চলল। তারপর অনি হাসতে হাসতে বলল, তাই ত বলি--বর্ষারূপের এত সাতকাহন বর্ণনা কেন।
    বর্ষা চমৎকৃত হল--বলল, কেন?
    অনি বলল, আপনার নাম বলে যে কথা...
    এ নিয়ে বর্ষাও খুব ঠাট্টাপরিহাস করল--বলল, পৃথিবীতে মনে করি ‘বর্ষাবৃষ্টি’ নাম খুবই সস্তা; এ নাম এতটা অমূল্য নয় যে, কেউ পেয়ে সাত রাজার ধন মনে করতে হবে। তবে নির্দিষ্ট কারও নাম হলে যে ছেলেরা অত্যোক্তি করতে ভুলে না তা জানি। মেয়েরা কিন্তু ছেলেদের কোন নামের নূতনত্ব নিয়ে আশ্চর্য বোধ করে না।
    অনি ম্লান হাসল--বলল, জানি, তবে...
    বর্ষা কৌতুকের হাসি হেসে বলল, মেয়েদের গুণগান গাওয়া ছেলেদের নব্য কোন বিষয় নয়, এটা ছেলেদের একান্ত স্বভাব--ছলচাতুরিও বলা যায় এবং নারীমুগ্ধতার কৌশলাবলম্বনও বটে।
    অনি আবারও ম্লান হাসল--বলল, কথাগুলো যদি আমার উদ্দেশ্যে বলা হয়, তবে বলব, আমি সত্যকে গলাটিপে হত্যা করে মিথ্যার আশ্রয়ে কখনো পথ চলি না এবং কারও সঙ্গে রসিকতা করতে পারি--প্রবঞ্চনা না। আমার আরও কিছু বিশ্রী স্বভাব আছে, আমি কাকে আঘাত করি ত ফুল দিয়ে--পাথর দিয়ে নয় এবং সাজা দিই ত শ্রীকান্তকারাগার--নির্জন কোন অন্ধকার দ্বীপ নয়। আঁধার ঘরে আমার জন্ম হয়েছে ঠিক কিন্তু অন্ধকারে পথ চলতে আমি মোটেও ভালবাসি না। আপনি কী মনে করছেন জানি না, তবে আমার কথাবার্তায় এমন কিছু যদি মনে করে থাকেন, তা হলে সেটা হবে আপনার নিতান্ত ভুল; কারণ, আমি কারও জীবন নিয়ে ঠাট্টা করতে পারি কিন্তু জুয়া খেলতে পারি না। বাঁশবাগানের প্রত্যেকটি বাঁশ যেমন একই ধাঁচের হয় না তেমন বিধিসৃষ্টির সকল জিনিসও কিন্তু এক রকমের হয় না।
    বর্ষা অনুতপ্ত হয়ে বলল, দুঃখ পেলেন বুঝি? আপনাকে দুঃখ দেওয়া ত আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আসলে মরণাবধি মানুষের শিক্ষার প্রয়োজন আছে, কথাটা নেহাত সত্য। উপহাসে মানুষ বিরক্ত হয় জানি কিন্তু উন্মত্ত হয় জানতাম না।
    অনি বলল, কিছু কিছু মানুষের এরকম বদাভ্যাস থাকা ভাল--যা আমি মনে করি।
    বর্ষা বলল, আপনার মনে করা আমার মোটেও মনে লাগেনি।
    অনি বলল, নাইবা লাগল বটে।তবে ওজনহারা মানুষকে কখনো আমি সুজন মনে করি না।
    বর্ষা বলল, এ কথাটা মনে লাগল। তারপর দিন যতই যাচ্ছে দুজনের বেশ ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠছে। একে অপরের প্রতি এখন সীমাহীন মুগ্ধ। বেশ মিলামিশাও চলছে আজকাল... ...

     

    বর্ষা মধ্যবিত্ত পরিবারের আদুরে মেয়ে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সকলের ছোট। বাবা হরনাথ প্রসাদ নিষ্ঠাবান একজন ব্যাংককর্মকর্তা। মা কাননবালা প্রাইমারি স্কুলশিক্ষিকা। দিদির প্রকাশনাম তৃষা। লিখিতনাম শ্রীমিতা দেবী। বিয়ে হয়েছে এক বছর পূর্বে এক বিত্তবান পরিবারে। থাকে স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায়। বড়দাদার নাম অতুলনাথ প্রসাদ। থাকে গ্লাফে। তেমন সুবিধা করতে পাচ্ছে না। মা বারবার হুকুম জানাচ্ছে ফেরত আসতে, সম্ভবত চলে আসবে। ছোটদাদার নাম প্রতুলনাথ প্রসাদ। বর্তমানে বিএ পড়ছে। বীরেন্দ্রনাথকলেজে ভর্তি হয়েছে, থাকে ছাত্রাবাসে। সংসার একেবারে ঝঞ্ঝাটমুক্ত বলা যায়।

     

    ইদানীং অনি আর বর্ষা কোন-না-কোন জায়গায় বা পার্কে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রেমের আলাপে মশগুল। একে অপরকে দিনদুয়েক না দেখলে মনে হচ্ছে যুগযুগের সমান। বর্ষার হাতে কোন মুঠোফোন নেই। বাবা-মার ফোনে কথা বলা ত দূরের কথা, হাত লাগানোরও অনুমতি নেই। এ পরিবারে মেয়েদেরকে খুব কড়া নজরে রাখা হয়। বাবা হরনাথের ধারণা, মোবাইল ফোনই একমাত্র পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের নষ্টের গোড়া। মা কাননবালাও স্বামীর সঙ্গে একমত। বর্ষা কলেজ যাওয়া-আসাতে অপরিচিত ফোনের দোকান থেকে অনির সঙ্গে জরুরি কথাবার্তা সাড়ে। তারপর নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হয় দুজন।

     

    আজ তেসরা ফাল্গুন। লালে লালে ছেঁয়ে গেছে কুষ্ণচূড়ার ডাল। পথের গাছগাছালি এক অপূর্বতায় সজীব। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত পথ। হাওয়ায় হাওয়ায় দোলে মাটি চুমতে চাইছে বাঁশঝাড়ের আগা। বর্ষার কাছে বড়বেশি ভাল লাগছে আজকের সকাল। এমন ভাল লাগার দিনে ভালবাসা যদি দূরে থাকে তবে আরও বেশি টান পড়ে ভালবাসার ডোরে। তাই সকাল দশটায় কলেজ যেতে অনির সঙ্গে বর্ষার কথা হয়েছে বিকাল চারটায় জগন্নাথোদ্যানে আসার। অনির ছুটি তিনটায় তবে এখানে আসতে হলে গাড়ির ঝঞ্ঝাটে ঘণ্টাখানিক লেগে যায়। কখনো বর্ষার একটু দেরি হলে আবার কখনো অনির--তবে বেশির ভাগ অনিরই হয়। কারণ সে একটা দায়িত্বে নিযুক্ত। আজ কারও বেশিক্ষণ দেরি হয়নি, পাঁচ-সাত মিনিটের ব্যবধান। তবু অনি একটু পরে আসাতে দুঃখপ্রকাশ করল--বলল, দুঃখিত লক্ষ্মীটি, অনেক চেষ্টা করেছি--আশা ছিল আজ তোমার আগে আসবই আসব কিন্তু এদেশের জ্যামের যে অবস্থা রে বাবা! আমার কপালটাই মন্দ বলে দুহাতে বর্ষার মুখখানি ধরে আলতোভাবে ঠোঁটে একটা চুমু খেল, বিনিময়ে বর্ষাও একটা উপহার দিল। খুব হাসিমাতি ঠাট্টামশকরা বেশ কতক চলল। এবার দুজন ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। হঠাৎ বর্ষা বলল, অনি নামটা আমার কেন জানি ভাল লাগছে না আর; তোমার একটা নাম দিতে চাই প্রিয়, যে নামটা হবে একান্ত আমার...
    অনি কোনকিছু জিজ্ঞেস না করে কৌতুকের সঙ্গে বলল, তাড়াতাড়ি দাওনা প্রিয়ে, শোনার জন্যে অধমের কর্ণ যে একেবারে ধৈর্যহারা হয়ে আছে।
    বর্ষা কোন চিন্তা না করে বলল, অন্ত। আবার একটু চিন্তা করে বলল, না না, ওটা নির্দিষ্ট একটা সীমারেখায় শেষ হয়ে যায়। তোমার নামের ‘অ’র পরে একটা ‘ন’ বাড়িয়ে তাকে করব অসীম আর তুমি হবে আমার অনন্ত।
    অনি বলল, বাহ্‌, চমৎকার ত! তা হলে তোমারও যে একটা নাম দিতে হয়--কী নাম দেওয়া যায় বল দেখি? অনিও একটু ভাবল--ভেবে বলল, সাধনা। আমি তোমার অনন্ত তুমি আমার সাধনা। আজ থেকে আমরা ‘অনন্তসাধনা’। একটু চুপ থেকে বলল, নামটা কেমন হল বলবে না?
    বর্ষা হেসে বলল, চমৎকার বলে যে আর কাজ নেই, একেবারে তুলনাহীন। তারপর দুজন নির্জন একটি গাছের তলায় বসল।

     

    সাধনার কোলে মাথা রেখে অনন্ত শোয়েআছে ঘাসের উপরে। এমন অপূর্ব ভালবাসায় বোধহয় প্রকৃতি সজীব। ফুলচয়-পশুপাখি-লতাপাতা-ঘাস--সৃষ্টির সমস্ত কিছু মনে হয় এ ভালবাসার কাছে বন্দি। এ জগৎসংসার ভালবাসারই সৃষ্টি? প্রায়ই নির্জন এ পার্ক প্রেমিকপ্রেমিকার জন্যে স্বর্গীয় এক বাগান বলা যায়। তার রূপের বর্ণনা করতে গেলে পাথেয় শেষ হয়ে যাবে কিন্তু পথ শেষ হবে না। তাই পাথেয় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে পথের সমাপ্তি জরুরি। বর্ষা বলল, এভাবে আমাদের মিলামিশা আর কত দিন অনন্ত? ভাল মনে হচ্ছে না। আত্মীয়জনদের কেউ যদি দেখে ফেলে, অন্তত আমার রক্ষা নেই।
    অনি বলল, আমায় রক্ষা করবে কোন্‌ বান্দায়?
    বর্ষা ম্লান হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল--বলল, তোমার পরিণতি যাই-ই হোক অনন্ত, আশা করি আমার মতো হবে না। অনন্তর পরিণতি তেমন নাইবা হল ঠিক কিন্তু এরকম সম্পর্ককে কেউ ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছে তাও ত আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি না।

     

    সত্যকে সত্তর পর্দার আড়ালে ঢেকে রাখলেও সত্য একদিন-না-একদিন উন্মোচন হবেই। এ গোপনীয়তাকে আর বেশিদিন গোপন রাখা গেল না। কারণ তাদের প্রেম এতটাই গাঢ় হয় যে, দুই পরিবারের পরিজনমহলে জানাজানি হতে দ্রুত কানাকানিতে নেমে আসে। বর্ষাদের স্বজনরা ধিক্কারশব্দে-হুঁ...হাঁ...একটা ম্লেচ্ছকে...কেউ বলছে, স্বজাতিতে এতই কি অভাব হয়েছে যে, একজন বিজাতিকে নিয়ে ঘর করতে হবে? ছি, লজ্জাশরম সংসার থেকে একেবারে উঠে গেল নাকি! ইত্যাদি বলে বর্ষার মা-বাবাকে লজ্জা দিচ্ছে। তারপর নিন্দুকের মুখে মুখে রচিত হয় বার হাজার নিন্দার আখ্যান।

     

    এদিকে অনির পরিবারবর্গে তেমন একটা হইহুল্লোর শোনা না গেলেও মামার বাড়ির দিক থেকে দুয়েক কথা শুনতে হয়নি এমন কথাও নয়। মামারা গোস্বায় লালনীল হয়ে বলছে, এমন বিজাতি...আমাদের সমাজে স্বীকৃতি নেই।
    মামিরা তেলেবেগুনে জ্বলে তার মায়ের কান ভরছে, চৌদ্দ গোষ্ঠীর মানইজ্জত ডুবাবে আরকি। নাহয় এমন বিধর্মীকে নিয়ে কেউ ঘর পাততে চায় বুঝি! তার বাপের ইজ্জত না থাকলেও না থাকতে পারে কিন্তু আমাদের আছে। তুমি তোমার ভাইদের সম্মান ভেস্তে দিতে পার না। এ মেয়ে বিয়ে করলে তুমি বিষ খাবে বলো।  

     

    এবার বর্ষার ভাইবোনদের কথামতো বর্ষাকে ঘরবন্দি করে স্কুল যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হল। অনির সঙ্গে কোনপ্রকার যোগাযোগ করবে থাক, তাকে কল্পনা করাও নিষিদ্ধ হল। বর্ষা পাগলপ্রায়, অনিও তাই। এভাবে দুজন মণিহারা সাপের মতো কাটছে কিছু দিন। আরেকদিন গভীররাতে অনি স্বপ্নে দেখছে, বর্ষাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোথায়--অনেক দূরে কোথায়। বর্ষার কান্নায় আকাশ ভেঙে চুরমার হচ্ছে বজ্রলীলায়। পৃথিবী ফেঁটে চৌচির হচ্ছে কেয়ামতের নমুনায়। হঠাৎ অনির ঘুম ভেঙে গেল। কী ভয়ানক দুঃস্বপ্ন! ভাবল, স্বপ্ন কি সত্যি হয়? আবার ভাবছে হতেও পারে। নিয়তি কোথায় এনেকাকে মিলায় এবং কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় নিয়ন্তা ছাড়া কেউ জানে না। অনি আর বর্ষার গতি কী এবং শেষ কোথায় সমাপ্তক ছাড়া তাই আমরাও জানি না।

    আরেকদিন বর্ষার ঘনিষ্ঠা বান্ধবী রিক্তার সঙ্গে অনির দেখা হল! যে নিরিবিলি পথের বাঁকে অনি আর বর্ষার অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। রিক্তার সঙ্গে কথা বলে যতটুকু শান্তি অনুভব করা গেল তারচেয়ে অনেকবেশি দুঃখ পেতে হল। বর্ষাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তার পিসির শ্বশুরবাড়ি কোথা বলে একাহারি। শোনে সাত আসমান ভেঙে যেন অনির মাথায় পড়ল। কণ্ঠ যেন চিরদিনের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। ভাগ্য যে কত নির্মম হতে পারে তার প্রমাণ পেল এবার। এ জগৎসংসার কতযে বিচিত্র ও চিত্রময়ী পদেপদে অনুভব হতে লাগল বারবার। দিশেহারা মন কী করবে কোন দিশেই খুঁজে পাচ্ছিল না। মনে হতে লাগল, আত্মহননে বোধহয় মুক্তি ও শান্তি। এমন সময় হঠাৎ আরেকদিন বর্ষার আরেক ঘনিষ্ঠা বান্ধবী শ্রেষ্ঠার দেওয়া একটা চিঠি এল! খাম খুলে জীবনপথের চিহ্ন দেখতে পেল। বর্ষার এ কাব্যচিঠিখানা অনির মৃত্যুর শহরে খুঁজে দেয় বাঁচার ঠিকানা :--

    হাজার বছর পরে

            হয়ত আবার দেখা পাবে আমার

            এ করুণার বাসভূমে হয়ত আর আসব না ফিরে

            এ বাংলার লোকালয় তখন হয়ত রবে না

            রবে না হয়ত বাংলাদেশের কোন চিহ্নপ্রতীক

    রবে না

            রবে না হয়ত জাতিভেদের কোন ভেদাভেদ

            রবে না রবে না হয়ত মানুষে মানুষে বিবেদবিদ্বেষ

            রবে না মৃত্তিকায় কেউ, রবে না অট্টালিকার আত্মগরিমায়

            ধনীগরিব উঁচুনিচু আর্যানার্য প্রভেদ ভুলে মনুষ্যজাতি হবে এক

    তখন

            হয়ত পৃথিবীর আরেক দেশে জন্ম হবে আমার অন্যরূপে

            তুমি হবে আরেক--হয়ত রবে দূরে--কিবা--তবু হৃদয়ের কাছে

            তোমার আঙিনার হলুদবনে গুলঞ্চলতার ফুলটিরে ভালবাসবে তুমি

            হয়ত সে আমি, অনুভবে সকল অনুভূতি করবে বন্ধু স্মরণ--

    তখন

            খুঁজে দেখো অই পথের ধারে কলমিডাঁটায় বসে আছে যেই ফড়িং

            তোমার বাড়ির উঠানে শজনেগাছে বসে আছে যেই হলুদ পাখিটি

            কিবা বসে আছে পেয়ারাডালে--বারবার উঁকি দিচ্ছে ওই ঘুলঘুলিতে

            অথবা তোমার চলার পথে দ্রোণ হয়ে জড়িয়ে আছে পায়ে

    টের পাবে না বন্ধু

            যে ভালবাসার সমাধি হয়ে চলে যাচ্ছি গহিনারণ্যে

            জেনে রেখো প্রিয়, সেখানে আমার কবর--

            এই যে এ বিদায়ের পল, এই যে অপূর্ণ ভালবাসাবিকল

            যদি কখনো পূর্ণ হয়--হোক তবে ওই ধরাধামে

    চিরানন্দের ভবে

            এ জগজ্জড়তার ছত্রছায়ায় চাই না একবিন্দু ঠাঁই

            চাই না নির্দয়ের কাছে করুণার কড়িমাত্র পাথেয়

            চাই না বিরূপ এ চরাচরে মানবরূপে জন্ম নিই আবার

            ধর্মান্ধতার যাঁতাকলে বলির মৃগ হতে চাই না পুন

    বন্ধু!

            আমায় যদি মনে পড়ে--তবে দেখো ওই নক্ষত্রের ধারে

            খদ্যোতাভায় জ্বলছে মিটিমিটি--দলেদলে করছে নর্তন

            হয়ত সেখানে আমি একজন আলোর মশাল জ্বেলে

            প্রিয়তমের প্রতীক্ষায় বসে আছি আহ্লাদে শুধু আহ্লাদের ঘরে

    মনে রেখো

            সেদিন ফুটবে না আর কোন বেদনার নীলোৎপল

            আসবে না আর কোন বিদায়ব্যথার করুণমুহূর্ত

            যেতে হবে না দূরে--অনেক দূরে প্রিয়জন ছাড়ি

            আজ যেতে বাধ্য--আমি নিরুপায় সামর্থ্যহীন

    বন্ধু যাই--

            অপরাধী আমি নই, তবে ভাবো যদি অপরাধী

            মানি বিধিলিখন ধন্য তবে ধিক্কারের বাণী যদি পাই

            আবার জন্ম যদি সত্যি হয় চাই না এ হিংস্রজীবন

            পুনর্জন্মে যদি আসি মাছরাঙা হয়ে অই নদীটির কিনারে

    ধন্য সেই জনম।


    পড়তে পড়তে অনির চোখের জলে চিঠিটা কবে ভিজে গেল টের পাওয়া যায়নি। একবার ভাঁজ করে রেখে দেয় পকেটে। আবার বের করে চুমু খায় : দুচোখে ঠেকায়--আবার পড়ে। মাতাল যেমন মদের নেশায় টলতে টলতে বারশ রাজ্যের স্বপ্ন দেখে ও বার হাজার দেশের মালিক বনে এবং একসময় হুঁশহারা হয়ে পড়ে; তেমন স্বপ্নের মালিক না হলেও একমাত্র সম্পদ বুকে চেপে অনিও স্মৃতির রাজ্যে টলমলাতে টলমলাতে হুঁশহারা হয় কখনো কখনো এবং বাঁচার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায় একটু একটু। এভাবে দীর্ঘদিন না চললেও বেশকিছু দিন পাগলের মতো চলছে!

     

    প্রত্যেক মানুষের মনে যে একজন কবি লুকানো থাকে, তার প্রমাণ আমরা বর্ষার এ একখানা চিঠির মাধ্যমে দেখতে পাই। মানুষ বলতেই কিছু-না-কিছু প্রতিভার অধিকারী আর এ অধিকার কোথায় গিয়ে কীভাবে লাভ হয় স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টির কোন জীব বলতে পারে না।

     

    অনির মনের অশান্তি আর দুঃখদুর্দশায় প্রায় বার বছর কেটে গেল, একবিন্দু শান্তি অনুভব করতে পারল না বিগত জীবনে। ইতোমধ্যে--মা মরে গেল। আরেকদিন আদরের বোনটিকেও বেঁধে দিতে হল চিরবন্ধনের ডোরে। অতঃপর বড়ই একা--এ একাকিত্ব জীবন আর ভাল লাগছে না। অস্থির মন কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এবার উদ্দেশহীন যাত্রা--শুরু হল বৈরাগ্যজীবন। আজ এখানে ত কাল ওখানে--গ্রাম হতে গ্রামান্তরে, দেশ হতে দেশান্তরে। কোথায় যাত্রাবসান--শেষঠিকানা কোথায় কে জানে। এ-ই দীর্ঘ দাড়িগোঁফ, লম্বা চুলে ধরেছে পাক। মলিন কাপড়পরিধানে চলছে...চলছে...চলছে...সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এক আশ্রমের দ্বারে এসে চলন শেষ! একশ চার ডিগ্রি জ্বরের তাপমাত্রায় স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না আর। কাশিতে বন্ধ হয়ে আসছে বুকের দম। সমস্ত শরীর ব্যথায় জর্জরিত। এবার মাটিতে লুঠিয়ে পড়ল রুগ্ন দেহ। লুণ্ঠিতের দুচোখ বেয়ে বয়ে যাচ্ছে নীরবে হাজার বেদনার কান্নাশ্রু। রমণীজনা এসে কোলে তোলে নিল পতিতজনের মাথা। চোখের জলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না রমণীর মুখ। স্নেহের আঁচলে মুছে দিচ্ছে রমণী পান্থের চোখের পানি। তৎক্ষণাৎ শুরু হল প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মুহূর্তে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে নেমে এল কেয়ামতের দুর্যোগ। তিনশ বত্রিশ কিলোমিটার বেগে ছুটছে বাতাস। প্রকৃতির সৌন্দর্য মিশমার করে বোধহয় এক্ষুনি নিয়ে যাবে নিজের আস্তানায়। এ দুর্যোগের ঘনঘটায় এবার ক্লান্তের রুগ্ন শরীরে অনুভব হতে লাগল অশ্বের শক্তি এবং দৃষ্টিক্ষীণ চোখের আলো যেন পুরোপুরিভাবে ফিরে এল। বর্ষাকে সহজেই চিন্তে পারছে অনি। আশ্চর্য অনুভব করে অপূর্ব ভালবাসার কণ্ঠে ডাকল, সাধনা! একে অপরকে ঝাপটিয়ে ধরল বুকে! আজ চব্বিশ বছর পর যেন স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করল বর্ষা। বিশ্বাস কেমন করে হয়। মানুষ যেখানে সাধারণ কিছুকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না, সেখানে অসাধারণকে বর্ষা কীভাবে বিশ্বাস করে। চারি দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে--না না, সবদিকে ঠিক আছে প্রকৃতি। বন্ধ হল বাতাসের গতি! হাজার প্রশ্নের সমাধি থেকে একটিমাত্র প্রশ্ন উদিত হয় দুজনার মনে--করতে চায় পৃথিবীকে ‘সমস্ত সৃষ্টির মালিক যেখানে রাখেনি প্রভেদ সেখানে সৃষ্টি কী অধিকারে করছে ভেদাভেদ?’ কান্নার জলে ভেসে যাচ্ছে দুজনার চোখ। অনি কাশতে কাশতে অতি ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ সাধনা? কণ্ঠে তার অপূর্ব ভালবাসার দরদ। বর্ষা চুমুই চুমুই ভরে দিল অনির মুখ। পৃথিবীটা স্বর্গ হয়ে দেখা দিল আবার দুজনার মনে...


    বর্ষা কেঁদে বলল, অনন্ত! কোনদিন কল্পনা করিনি প্রিয় নামটা আবার ডাকতে পারব।
    অনি দরদভরা কণ্ঠে বলল, প্রিয়ে! পৃথিবীটাই ত একটা অঘটনের জায়গা, যা কল্পনা করা হয় তা কখনো ঘটে না আর যা ঘটে যায় তা কখনো কল্পনা করা হয় না। মনে রেখো, প্রেমের জন্যে সৃষ্টি--সৃষ্টির জন্যে প্রেম নয়। অনির গলার স্বর ক্ষীণ হয়ে আসছে তবু কৌতূহলীকণ্ঠে অপূর্বতার দরদ...
    বর্ষা ব্যথিতকণ্ঠে--কান্নামিশ্রিতগলায় বলল, সেই অনেক কথা... ...এক সুযোগে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসি। ভাগ্যক্রমে এ আশ্রমের কর্ত্রীর নিকট আশ্রয় পাই। বড়ই মহতী ছিলেন নিঃসন্তান এ মঠকর্ত্রী। আমাকে নিজসন্তানের মতো ভালবাসতেন। তারপর আমার হাতে আখড়ার ভার সোপর্দ করে আরেকদিন চলে গেলেন ঈশ্বরের ডাকে। সংক্ষিপ্ত এটুকু বর্ণনাশেষে যখন বলতে লাগল--চল মঠে যাই। ততক্ষণে অনির চোখে ঘুম এসে গেছে। দেখা গেল, এ তো কোন সাধারণ ঘুম নয় জীবনের একমাত্র নিদ্রা... ...আর একফোঁটা চোখের জল বিসর্জন দিতে হল না বর্ষা, একটুপর টলে পড়ে তার নিথর দেহ অনির বুকের উপর। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যায় পৃথিবীর নাড়ির বন্ধন! থেমে গেল সব কোলাহল! মিটে গেল অনন্তসাধনার অপূর্ব ভালবাসা!

     

    বর্ষার হতভাগ্যকপাল। হতভাগ্য এজন্যে যে, জীবৎকালেনা সে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, না প্রতিভাবান হিসেবে। পৃথিবীতে বর্ষায় সম্ভবত একমাত্র কবি বা লেখক, যে মৃত্যুর অনেক দিনপর পরিচিতি লাভ করতে পেরেছে। আমরা জানি, ভাল কর্মের ফল সব সময় ভাল। চুপকথা ছদ্মনামে যে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ একজন অলেখিকায় লিখে গেছে, আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে করেছে আরও বৃদ্ধি এবং আরও সমৃদ্ধশালী। আমরা চুপকথার যত লেখাই পড়ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি! সাহিত্যজগতে আজ অমূল্য সম্পদ হিসেবে গণনা হচ্ছে চুপকথার রচনাবলী।

    ১০ শ্রাবণ, ১৪১৮ সাল, চট্টগ্রাম।

  • ওয়াহিদ  মামুন
    ওয়াহিদ মামুন গভীর প্রেমের গল্প। প্রতিভার স্বীকৃতি বেঁচে থাকতে অনেকেই পায় না। মানুষ বড়ই কৃপণ। বেঁচে থাকাকালীন কর্মের স্বীকৃতিটুকু দিলে অনেক তৃপ্তি পাওয়া যায়। খুব ভালো একটা গল্প লিখেছেন। শ্রদ্ধা জানবেন।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২২ এপ্রিল, ২০১৪